TDK_ক্যাসেট

বাকী চৌধুরী : দশম শ্রেনীতে পড়ার সময় হঠাৎ একদিন আমার নামে পাঠানো একটি ছোট্ট পার্সেল নিয়ে ডাকপিয়ন আসে। যথারীতি সই করে পার্সেলটা রেখে ভাবতে লাগলাম পার্সেলটা কোথা থেকে এবং কে পাঠালো! কারন, পার্সেলের কোথাও প্রেরক/প্রেরিকার নাম নেই।সেই সময় আমি আমার নানাবাড়ীতে থেকে লেখা পড়া করতাম।সবাই জড়ো হয়ে খুলে দেখতে চাইলেন পার্সেলটাতে কি আছে? পার্সেল বক্সের উপরে লাগানো ডাক টিকিটগুলো রাণীর দেশের। সেই সময় ইংল্যান্ডে আপনজন বলতে আমার বড় মামাই ছিলেন। মনে মনে ভাবতে লাগলাম- মামা যদি আমাকে কিছু দিয়েই থাকেন, তবে তো পার্সেল আমার নামে পাঠাতেন না! সেই যাই হউক, সবার পীড়াপিড়িতে বক্সটি খুলে দেখি একটা TDK ক্যাসেট আর শুকানো একটি গোলাপ। সবার মতো আমি ও অবাক! কে পাঠালো এটি! তখনকার দিনে মধ্যপ্রাচ্যে বা প্রবাসে যারা একা থাকতেন, তাদের কাছে এরকম রেকর্ডিং ক্যাসেট পাঠানো হতো তাদের প্রিয়জনদের কথামালা। সবার আগ্রহ আরো বাড়তে থাকলো ক্যাসেটে কি রেকর্ড আছে? আমার মামা পশ্চিম জার্মানীতে থাকার সময়ে বড়সড় Sony ব্রান্ডের একটি টেপ রেকর্ডার পাঠিয়েছিলেন। পড়ালেখার জন্য আমরা শুধু সিলেট রেডিও স্টেশন থেকে প্রচারিত অনুরোধের আসর ‘অনুরাগ’ অনুষ্টানটি শুনতে পারতাম, আর আমাদের নানা রাত পৌনে আটটায় বিবিসি বাংলার ‘প্রবাহ’ এবং রাত দশটায় ভয়েস অব আমেরিকা থেকে প্রচারিত সংবাদ নিয়মিত শুনতেন- বলাবাহুল্য, সেই সময়ে স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তীব্র আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সন্ধ্যার পর যখন ক্যাসেটটা সবাই শুনতে লাগলেন তখন শুরুতেই ক্বারী আমির উদ্দীনের একটি গান শুরু হলে সবাই আস্তে আস্তে চলে গেলেও আমার ছোট খালার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিলো আমার উপর। গানটি শেষ না হতেই নানার ডাক পড়লো টেপ রেকর্ডারটা নিয়ে যাওয়ার জন্য, উনি বিবিসির প্রবাহ অনুষ্টান শুনবেন। সে যাত্রায় আর ক্যাসেটটা শুনা না হলেও পরে একদিন সময় করে একাকী ষাট মিনিটের রেকর্ডটি শুনলাম। এটা ছিলো আমার টিনএজ বয়সের একজন গুনবতী প্রেমিকার প্রেমের আর্তনাদ।সেদিন নিজেকেও ভাগ্যবান মনে হলো এই কারনে যে সুদূর ইংল্যান্ড থেকেও কেউ আমাকে এতো ভালোবাসতে পারে! মনে মনে ভাবলাম What a gift? এভাবেও কেউ প্রেম নিবেদন করে? বেশ কয়েক বছর পূর্বে আমার বড় মেয়ে যখন ইয়ার নাইনে পড়ে, তখন পেরেন্টস ইভিনিংয়ের জন্য ওর সাথে স্কুলে যাই।যদিও আমার কাজ বিকালের শিফটে থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পেরেন্টস ইভিনিংয়ে যেতে পারিনা। ঐ বৎসর ওর মা জেদ ধরে বললেন উনি শুধু কেন একা একা যাবেন, এইবার আমি যেনো মেয়ের সাথে যাই; কাজ থেকে সেদিন ছুটি নিয়ে মেয়েকে সাথে করে ওর স্কুলে যাই। সেখানে অনেক অভিবাবকের সাথে দেখা হয়। এক ফাঁকে হঠাৎ করে আমার মেয়ের বান্ধবী মাহিমা, আমাদেরকে নিয়ে ওর মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে দেখো আম্মা- আমার বান্ধবীর আব্বা ওকে নিয়ে এসেছেন, অথচ আমাদের আব্বা একদিন ও আসেন না আমাদের সাথে। ওর মা কে দেখে তো আমি অবাক! যদি ও চুলের ফিতা কাটার জায়গায় দু’চারটি চুল সাদা হয়ে গেলেও সেই অসম্ভব সুন্দর দুটি চোখ আর নজরকাড়া হাসিটা এখনো ওর মায়াবী মুখখানায় লেগে আছে। যখন মাহিমার মায়ের সাথে কথা বলি তখন আমার কানে বাজতে থাকে TDK ক্যাসেটের গুনবতী প্রেমিকার সুরেলা কন্ঠস্বর! কিছুক্ষন আলাপের পর বিদায়ের সময় মাহিমার আম্মা আমার মেয়েকে বললেন, তুমি তোমার আব্বা আম্মাকে নিয়ে আমাদের বাসাতে বেড়াতে আসিও, যথারীতি আমি ও বললাম- আপনারা ও আসবেন কিন্তু। রাস্তায় গাড়ী চালিয়ে আসার সময় ভাবতে লাগলাম, আর মনে মনে বললাম- দেখো সালেহা- দুনিয়াটা কতো ছোট; কোনদিন ভাবিনি তোমার সাথে এভাবে দেখা হবে! তোমার বাবার পাঠানো স্পন্সরশীপে যেদিন তুমি ইংল্যান্ড চলে আসো, সেদিন স্কুল ফাঁকি দিয়ে তোমার সংগে যখন শেষবারের মতো দেখা করতে যাই, সেদিন তোমাদের পুকুরঘাটের বিশাল নারিকেল গাছটার নীচে দাড়িয়ে আমার হাত ধরে বলেছিলে, আমি তোমাকে মুখ ফুটে যে কথাটি বলতে পারিনি সেই কথাটি মন খুলে বলছি- “আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি, আমি কখনো চাইনা আমাদের ভালোবাসাটা হারিয়ে যাক, আর আমার যেদিন বিয়ে হবে সেদিন লাল টুকটুকে শাড়ী পরে সারাজীবন তোমার জীবনসংগীনী হয়েই থাকতে চাইবো।” সেদিন তোমার বিদায়ের পর আমি ও তোমার মতো মনের অজান্তে চোখের জল ফেলেছি। এরপর বেশ কয়েকবছর আমাদের যোগাযোগ ছিলো।আমার খুব মনে পড়ে, একবার তুমি লিখেছিলে- “তোমার সঙ্গে দেখা হবে আজ না হোক কাল, তুমি আমার সঙ্গী হবে থাকবে চিরকাল।” আমার বিএসসি ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে তুমি জানালে যে তোমার আব্বা তোমাকে বিয়ে দিয়ে দিতে চান এবং আর বেশিদিন অপেক্ষা ও করতে চান না। তুমি বললে যে বিয়ে করলে আমাকেই করবে, এবং আরো বলেছিলে আমি রাজী হলে তুমি ইংল্যান্ড থেকে একাকী এসে আমাকে বিয়ে করতে ও প্রস্তুত। জানো সালেহা, তোমার চিঠিটা পড়ে সেদিন ও তোমার জন্য অনেক্ষন কেঁদেছি, সেদিন মধ্যবিত্ত ঘরের বড় সন্তান হিসেবে সাহস আর সামর্থ্য না থাকায় তোমাকে না জানিয়ে তোমার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেই; যদিও তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম এভাবেই- “যে প্রেমের প্রসারিত রুপ ছিল কল্পনাময়, অলিখিত দলিলে ছিল বিশ্বাসের স্বাক্ষর, বাস্তবতা ঠিক তার বিপরীত প্রক্রিয়ায়- দাবিদার হয়েও দেখাতে পারেনি অক্ষর।” তারপর তুমি অনেক চেষ্টা করেছো যোগাযোগ করতে। এতোদিনে সুরমা, কুশিয়ারা আর টেমসে অনেক জল গড়িয়েছে, তোমাকে দেখে আজ অনেক ভালো লাগছে এই ভেবে যে তুমি কারো না কারো ঘরনী হয়েছো, ফুটফুটে বাচ্চাদের মা হয়েছো।এভাবেই নিজের মনের সাথে কথা বলে বলে ঘরের নীচে গাড়ী পার্ক করে বসে আছি, এমন সময় মেয়ের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পাই, যখন সে বলে – আব্বা, বসে আছে কেনো, ঘরে যাবে না? পেরেন্টস ইভিনিংয়ের রিয়েকশনটা শুরু হয় সন্ধার পরপরই, যখন আমার মেয়ে তার মাকে বলে জানো আম্মা, আমার সব বান্ধবীরা আব্বাকে দেখে বলে তোর আব্বা দেখতে অনেক স্মার্ট, তোর আম্মার চাইতে তোর আব্বাকে অনেক ইয়াং দেখায়! কাটা গায়ে নুনের ছিটা লাগায় পরেরদিন যখন মাহিমার আম্মা ফোন করে আমার ঘরনীকে দাওয়াত করে ওদের ঘরে যাওয়ার জন্য, এর সাথে যোগ করে ভাইকে নিয়ে আসবেন কিন্তু! উনার সংগে আজ স্কুলে দেখা ও হয়েছে এবং কথা বলে অনেক ভালো লেগেছে, উনি আসলেই খুব ভালো মানুষ। ফোন রেখেই ‘ঘরনী’ অগ্নিমুর্তি ধারন করে বললেন, আর স্কুলে কাউকে যেতে হবে না, আমিই যাবো! তোর আব্বা পেরেন্টস ইভিনিংয়ে গিয়েছিলেন না তোর বান্ধবীদের মায়েদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন? সাথে সাথে মেয়ে প্রতিবাদের সুরে বলে, আব্বা নিজে থেকে যান নাই, মাহিমাই নিয়ে গেছে ওর মায়ের কাছে। আহারে, দু’জনের মা আগে কতোদিন ফোনে কতো কথা বলতো, স্কুলেও দেখা হতো; অথচ কোনদিন কোন অসুবিধা হয় নাই! বেশকিছুদিন যাবার পর একদিন আমাদের কাজে বৈদ্যুতিক ত্রুটির জন্য কাজ না করেই অকস্মাৎ ঘরে চলে আসতে হয়, এসেই দেখি মাহিমা, তার বড় এক বোন ও তার মা আমাদের ঘরে! আমি পরিচিতি শেষ করে উপরে চলে যাই। বেশ কিছুক্ষন পর নীচে আসলে শুনতে পাই, মাহিমা তার মা’কে বলছে আম্মা তুমি না বললে গান শুনাবে, শুরু করো। আমার মেয়েটি অনেক লজ্জাবতী, সে বলে উঠে আজ না আন্টি অন্য আরেকদিন, আজ আব্বা ঘরে! সাথে সাথে মাহিমার আম্মা বলে ওঠেন, শুনো- তুমি আর মাহিমা যেরকম ফ্রেন্ড, আমি আর তোমার আব্বাও সেরকম ফ্রেন্ড ছিলাম, ইয়ার টেন পর্যন্ত আমরা একসাথে পড়ালেখা করেছি, তোমার আব্বা আমার কন্ঠে গাওয়া অনেক গান শুনেছেন। আমি ওদের সামনে এসে চোখ টিপে, দাঁত কামড়ে বলতেছি, প্লিজ সালেহা বন্ধ করো, তুমি সহজ সরল ভাষায় সাবলীল ভঙ্গিতে সবকিছু বিশ্লেষণ করে যাচ্ছো ঠিকই কিন্তু রিয়েকশনটাতো পরে আমাকে একাই বহন করতে হবে! কে শোনে কার কথা! সেদিন সেই TDK ক্যাসেটের রেকর্ডিং আমি ছাড়া কেউ শুনতে না পেলেও আজ তোমার লাইভ প্রোগ্রাম সবাই খুব উপভোগ করবে! সে বলতেই থাকে, শুনো – তোমার আব্বা লেখাপড়ায় ভালো ছিলো, আমি কিন্তু স্পোর্টস এবং মিউজিকে ভালো ছিলাম। আমরা স্কুলে গিয়ে কতো ধরনের খেলাধুলা করতাম, এখনো মনে পড়ে ধানখেতের আইল ধরে দৌড়াতাম আর যে হারতো তাকে ধান খেতের মধ্যে জাপটে ধরতাম আরো কতো কি….. আহারে সালেহা, তুমি তোমার পুরানো ক্যাসেট আজ যেভাবে বাজালে, আর গল্পটা অসমাপ্ত রেখেই চলে গেলে আবার, যাওয়ার বেলায় শিউলিফুলের গন্ধের মতো এক আবেশ ছড়িয়ে দিয়ে গেলে আমার মনে…..

পুনশ্চ: সালেহা চলে যাবার পর ঘরের ভিতরে কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো তা বেচারা আমি ছাড়া আর কেউ জানলো না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *