’জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার:
৩০০ টাকা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় ট্রেন আটকিয়ে বিক্ষোভ আন্দোলন করেছেন চা-শ্রমিকরা। উপজেলার ১২টি চা-বাগানের প্রায় কয়েক সহস্রাধিক শ্রমিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল করে। দুপুর দেড়টার দিকে বিক্ষোভ মিছিলটি নিয়ে শ্রমিকরা কুলাউড়া পৌর শহরের স্কুল চৌমুহনী এলাকায় গিয়ে সমবেত হয়। সেখানে দুপুর দেড়টা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত চলে তাদের এই কর্মসূচী। এসময় চা-শ্রমিক ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের বাগান মালিকদের ‘দালাল’ বলে আখ্যায়িত করে তাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এদিকে চা-শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে কুলাউড়া পৌরসভার স্কুল চৌমুহনী এলাকায় প্রধান সড়কের চারপাশে কয়েক শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন মানুষ।
এদিকে বিকেল ৪টায় বিক্ষুব্ধ চা-শ্রমিকরা তাদের মজুরী আদায়ের দাবিতে কুলাউড়া স্কুল চৌমুহনী এলাকায় রেলগেইটে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি আটকিয়ে বিক্ষোভ আন্দোলন করে। এসময় ভোগান্তিতে পড়েন ট্রেনে থাকা যাত্রীরা। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে শ্রমিকরা আন্দোলন শেষ করলে প্রায় ১ ঘন্টা ২০ মিনিট পর বিকেল পাঁচটা ২০ মিনিটে ট্রেন চলাচল ও বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সড়ক চলাচল স্বাভাবিক হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কুলাউড়া সার্কেল) সাদেক কাওসার দস্তগীর, কুলাউড়া পৌর মেয়র অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান, কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: আব্দুছ ছালেক, ওসি (তদন্ত) মো: আমিনুল ইসলাম, কুলাউড়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান মোসাদ্দিক আহমদ নোমান, পৌর কাইন্সিলর আতাউর রহমান চৌধুরী ছোহেল চা-শ্রমিকদের আন্দোলনস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চা-শ্রমিকদের ধর্য্য ও শান্ত থাকার আহবান জানিয়ে তাদের দাবি দাওয়া আদায়ের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হবে বললে চা-শ্রমিকরা বিকেল সাড়ে পাঁচটায় তাদের আন্দোলন শেষ করে বাগানে ফিরেন।
সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার গাজীপুর, মেরিনা, কালিটি, রাঙ্গিছড়া, মুড়াইছড়া, আসকরাবাদ ও রাধানগর চা-বাগানের কয়েক সহ¯্রাধিক শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে বাগান থেকে বের হয়ে স্কুল চৌমুহনীতে এসে একত্রিত হয়। চা-শ্রমিকদের সংগ্রাম চলবে চলবে, মজুরী বৃদ্ধির সংগ্রাম চলবে চলবে, সুচিকিৎসার সংগ্রাম চলবে চলবে, যে হাত শ্রমিক মারে সেই হাত ভেঙ্গে দাও, চা-শ্রমিকের দালালরা, হুশিয়ার সাবধান, চুক্তি নিয়ে টালবাহানা চলবে না চলবে না, ৩০০ দাও নইলে বিষ দাও, ১৪৫ টাকা মজুরী মানি না, ৩০০ টাকা মজুরী দিতে হবে দিতে হবে, চা-শ্রমিকের নায্য দাবি মানতে হবে মানতে হবে লেখা সম্বলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এসময় অনেক শ্রমিক রাস্তায় শুয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এছাড়া চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের উদ্দেশ্যে করে বলেন, দালালদের চামড়া, তুলে নেবো আমরা, রামভোজনের চামড়া, মাখনলালের চামড়া, নৃপেন পালের চামড়া, বিজয় হাজরার চামড়া, শহীদুলের চামড়া,সঞ্জুর চামড়া তুলে নেবো আমরা বলে শ্রমিকরা শ্লোগান দিতে থাকেন। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা চা- শ্রমিক ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের নাম সম্বলিত প্ল্যাকার্ড আগুন দিয়ে তাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। এদিকে তাদের এই আন্দোলনে চা-বাগানের শিক্ষার্থীরাও দাবি আদায়ের আন্দোলনে মাঠে নেমেছেন। এসময় কুলাউড়ার প্রধান সড়কের দুই পাশে শত শত গাড়ি আটকা পরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এদিকে কুলাউড়ার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের লুয়াইউনি হলিছড়া, হিঙ্গাজিয়া, সিরাজনগর, রাজনগর, বরমচালসহ আরো কয়েকটি চা-বাগানের শ্রমিকরাও সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেছেন।
বিক্ষোভে অংশ নেয়া কালিটি চা-বাগানের শ্রমিক দয়াল অলমিক, অপু দাস, গৌরি অলমিক বলেন, ১৩ দিন ধরে অনাহারে দিন কাটিয়ে আমরা মজুরী বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করছি। আর শ্রমিক নেতারা মালিকপক্ষের সাথে বৈঠকে বসে মনগড়া সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। শ্রমিকরা নেতারা দালালি করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন আর আমরা সাধারণ শ্রমিকরা খেয়ে না খেয়ে আন্দোলন করছি। তারা দালাল, বেঈমান, ভন্ড। তাদের নেয়া সিদ্ধান্ত আমরা প্রত্যাখ্যান করলাম। তারা ১২০ টাকা মজুরী নিয়ে কাজে ফিরার সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও আমরা চা-শ্রমিকরা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে বাগান মালিকপক্ষ ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা আমাদের সাথে টালবাহানা করছেন। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিপেন পাল মঙ্গলবার বিকেলে এই প্রতিবেদককে বলেন, সবাই এখন আন্দোলনমুখী। হুঠ করে জেলা প্রশাসন থেকে ওইদিন আমাদের বৈঠকে বসার কথা বলা হয়েছে। সেখানে আমাদের বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী মজুরী বৃদ্ধির বিষয়টি দেখবেন। তাৎক্ষনিক হওয়ায় শ্রমিকদের বৈঠকের বিষয়টি জানানো হয়নি। এখন যেহেতু বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিবেচনাধীন সেহেতু আমরা সাময়িক আন্দোলন প্রত্যাহার করে শ্রমিকদের কাজে ফেরার জন্য সব ভ্যালী কমিটির নেতাদের বলেছি। আমার ধারণা, বাগানের সাধারণ শ্রমিকদের আমাদের প্রতিপক্ষরা উস্কিয়ে দিয়ে উল্টো বুঝিয়েছেন, এজন্য তারা না বুঝে এখন আন্দোলন করছে। শ্রমিক ইউনিয়নের সকল নেতাকে বাগান মালিকপক্ষের দালাল বলে আখ্যায়িত করে তাদের কুশপুত্তলিকা দাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা আর কি বলবো। শ্রমিকদের জ্ঞানবুদ্ধি অনুযায়ী তারা সেটা করেছে।

