ঝিমাই চা-বাগানের গাছ কাটতে বাঁধা বিঘ্নিত হচ্ছে বাগানের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার:

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ঝিমাই চা বাগানের জমিতে বসবাসরত খাসিয়াদের নানা অপতৎপরতা ও নানা অজুহাতে চা বাগানের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। বাগানের পরিপক্ব গাছ কাটতে খাসিয়াদের বাঁধার কারণে চা-বাগান সম্প্রসারণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে একদিকে সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খাসিয়ারা মূলত বাগানের চা উৎপাদন, সম্প্রসারণ ও বাগানের সার্বিক উন্নয়নে বাঁধা দিচ্ছে। বিশেষ করে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে তারা কুলাউড়া থানা, উপজেলা অথবা জেলা পর্যায়ে কোনো আবেদন নিবেদন না করে চলে যায় উচ্চ আদালতে। বার বার উচ্চ আদালতে খাসিয়ারা পরাজিত হওয়ার পর ঝিমাই পুঞ্জির মান্ত্রী (হেডম্যান) রানা সুরং বিভিন্ন নতুন ইস্যু সৃষ্টি করে হাইকোর্টে রিট করেন। কিন্তু উচ্চ আদালতের রায় আসে বাগানের পক্ষে। এরপর ক্ষান্ত হননি পুঞ্জির হেডম্যান রানা সুরং। বাগানের নিরাপত্তা ও উন্নয়নে তিনি বাঁধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেড ১৯৬৮ সালে ৬৬১.৫৫ একর বিশিষ্ট ঝিমাই চা-বাগানটি সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নেয়। বন্দোবস্ত নেওয়ার পর ৩১০ একর ভূমিতে চা-গাছ লাগানো হয়েছে। বাকি ভূমির মধ্যে প্রায় ৫ একরে রয়েছে বাগানের অফিস, ফ্যাক্টরিসহ অন্যান্য স্থাপনা রয়েছে। আগামী ২০৫২ সাল পর্যন্ত বাগানটি সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয়া। প্রতিবছর ভূমি উন্নয়ন করসহ সরকারকে সকল রাজস্ব দিয়ে আসছে বাগান কর্তৃপক্ষ। বাগানের লিজ নেওয়া ৩৭১ একর ভূমি দখল করে ৪৪টি খাসিয়া পরিবার পান চাষ ও বাড়িঘর তৈরি করে বসবাস করছে। বাগানের লিজকৃত ভূমি থেকে পুরাতন গাছগুলো কেটে চা-বাগান বন্দোবস্ত চুক্তি অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ বাগান সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। নতুন চা-গাছ লাগানোর লক্ষ্যে বাগানের প্রায় দুই হাজার গাছ কাটার জন্য চা বোর্ড এবং বনবিভাগে লিখিত আবেদন করে বাগান কর্তৃপক্ষ। পরে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় নতুন চা গাছ লাগানোর স্বার্থে উল্লেখিত গাছ কাটার অনুমতি দেয়। অনুমোদনকৃত গাছ কাটার লক্ষ্যে বন বিভাগের লোকজন গাছ চিহ্নিত করতে গেলে খাসিয়ারা তাদের বাঁধা দেয়। ৫০ বছরের বেশি বয়সী গাছগুলো প্রাকৃতিক কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে পুঞ্জির মান্ত্রী রানা সুরং কৌশলতা অবলম্বন করে ২০১৫ সালে হাইকোর্টে রিট করলে হাইকোর্ট রিট আবেদনটি খারিজ করে দেয়। মামলায় খাসিয়ারা হেরে গেলে আবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল ডিভিশনে রিভিউ করলে সেটাও খারিজ করে দেয় উচ্চ আদালত এবং শর্ত সাপেক্ষে গাছ কাটার অনুমতি দেয় বাগান কর্তৃপক্ষকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রানা সুরংয়ের পিতা ফিল প্রতাম খাসিয়া ঝিমাই চা বাগানের কিছু জায়গায় বসতি স্থাপন করে পান চাষ শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে তাঁর আত্মীয় স্বজন ও অন্যান্য জায়গা থেকে অনেক খাসিয়াকে এনে ঝিমাই পুঞ্জিতে আশ্রয় দিলে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অবশ্য ফিল খাসিয়ার সময়ে পুঞ্জিতে কোনো পাকা দালান ছিল না। ফিল প্রতাম খাসিয়া মারা যাওয়ার পর গত ১০-১২ বছর থেকে রানা সুরং পুঞ্জির হেডম্যানের দায়িত্ব পেয়ে অনেকটা জোরপূর্বক পাকা দালান নির্মাণ করেছেন। তাঁর পুঞ্জিটি বাগানের অভ্যন্তরে এবং বাগানের লিজকৃত জায়গার মধ্যে পড়েছে। আর ঝিমাই পুঞ্জিতে ৪০-৪৫ পরিবার বসবাস করে পান চাষ করে লাখ লাখ টাকার আয় করছে যা থেকে সরকার কোন রাজস্ব পাচ্ছে না। রানা সুরং বাগানের বিরুদ্ধে যে কোনো অজুহাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার নাম করে পুঞ্জির নিরীহ খাসিয়াদের থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করেন। কারণে-অকারণে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় তার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেন অনেক সাধারণ খাসিয়া পরিবার। তারা রানা সুরংয়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পায়। তিনি চা বাগানের পরিপক্ব (বয়স্ক) গাছ কাটতে বাঁধা প্রদান, বাগানের রাস্তা দিয়ে জোরপূর্বক পান বিক্রির গাড়ি চলাচলের অপচেষ্টা ও বাগানের চা সম্প্রসারণে বাঁধাসহ নানাভাবে চা শিল্পের উন্নয়নে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ব্যক্তি স্বার্থের জন্য ঢাকা থেকে বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আসেন তাঁর পক্ষে কথা বলার জন্য। সবকিছুতেই ব্যর্থ হয়ে নতুন নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে রানা সুরং।

ঝিমাই পুঞ্জির মন্ত্রী (হেডম্যান) রানা সুরং মুঠোফোনে বলেন, প্রাকৃতিক গাছ কাটলে পুঞ্জির লোকেরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। তাছাড়া এই প্রাকৃতিক গাছ বাগানের রোপিত নয়। গাছ কাটলে খাসিদের জীবিকায় আঘাত হানবে এবং পরিবেশের ভারসাম্যর বিরাট ক্ষতি হবে। রিট আবেদন খারিজের বিষয়ে তিনি বলেন, মামলাটি পুনরায় শুনানীর জন্য আমরা উচ্চ আদালতে আপীল করেছি। পুঞ্জির নিরীহ খাসিয়াদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায়ের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং মুঠোফোনে বলেন, চা বাগান কর্তৃপক্ষ ঝিমাই পুঞ্জির পান জুমের আওতাধীন প্রাকৃতিক গাছ নিজেরা রোপন না করেও অসাধুভাবে কাটার পাঁয়তারা করছেন। আমরা জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছি, বাগান কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র তাদের চা সেকশনের ছায়াবৃক্ষ বিধি মোতাবেক কর্তন করতে পারেন কিন্তু কোন অবস্থাতেই খাসিয়াদের জীবন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ঝিমাই পুঞ্জির পান জুমের প্রাকৃতিক গাছ কাটা যাবে না।

বন বিভাগের কুলাউড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ রিয়াজ উদ্দিন জানান, বাগান কর্তৃপক্ষের সৃজিত এবং প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া গাছ বাছাই করে কাটার জন্য অনুমোদনকৃত গাছ চিহ্নিত করার কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে জেলা পরিবেশ ও বন কমিটির সভায় গাছ কাটার বিষয়টি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

ঝিমাই চা বাগানের ব্যবস্থাপক মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, পুঞ্জির লোকজন চা বাগানের ৩৭১ একর জায়গা দীর্ঘদিন থেকে জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে। এ নিয়ে আদালতে মামলা দিলে সকল মামলার রায় তাদের পক্ষে এসেছে। তিনি বলেন, তারা যে মামলার কথা বলছে সেটি ২০২১ সালের ২রা সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে খারিজ হয়ে গেছে। কাজেই জায়গা ফিরে পেতে ও গাছ কাটতে এখন আইনি কোনও বাঁধা নেই। তিনি বলেন, তারা যেখানে বসবাস করছে সেটিও বাগানের জায়গা। সরকারী সকল আইন মেনে প্রতিবছর চা বাগানের সম্পূর্ণ জায়গার জন্য তারা সরকারকে রাজস্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ২ হাজার গাছ কর্তনের অনুমতি চাইলেও সবগুলো পানপুঞ্জি এলাকার নয়, তাদের বাগানের গাছও আছে। তারা মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে মামলা খারিজ হওয়ার একটি কপিও সরবরাহ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *