নজরুল ইসলাম খান : প্রাণী জগতের প্রত্যেককে একদিন মৃত্যূর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, এটা চিরন্তন সত্য। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু মাটি পর্যন্ত কাঁপায়। কিছু মৃত্যূর সংবাদ সারা বিশ্বকে খুব পীড়া দেয়, অশ্রুসিক্ত করে, স্তদ্ধ করে দেয় তেমনি একজন দীর্ঘ লড়াই আর আপোষহীন নেতৃত্বের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়া আমাদের প্রিয় নেত্রী একজন গৃহবধু থেকে গণতন্ত্রের মাতায় পরিণত হয়েছিলেন। ত্যাগ ও সংগ্রামে ভাস্বর হয়েও তিনি ছিলেন দেশের সত্যিকারের অভিভাবক; এমন একজন আলোকবর্তিকা যাঁর অপরিসীম ভালোবাসা আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়েও শক্তি ও প্রেরণা যুগিয়েছে। তিনি বার বার গ্রেফতার হয়েছেন, সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, সর্বোচ্চ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তবুও যন্ত্রণা, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও তিনি অদম্য সাহস, সহানুভূতি ও দেশপ্রেম সঞ্চার করেছিলেন দেশের আপামর জনতার মাঝে দেশের জন্য। সংযমী, সংগ্রামী, সহনশীল, সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল, সব রকম অন্যায়ে সর্বংসহা, অহিংস, আপসহীন, দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক—এসব বিশেষণের কোনোটিই তৃতীয় বিশ্বের এই সফল স্টেটসম্যানের জন্য যথেষ্ট নয়। গোটা বিশ্বে তার সমসাময়িক বেশ কিছু ত্যাগী ও সংগ্রামী নেতা জুলুম-নির্যাতন সইতে সইতে আর না পেরে জীবন সায়াহ্নে এসে বলদর্পী রিজিমের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন।এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেবল খালেদা জিয়া। তার ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেছেন—এমন কোনো দৃষ্টান্ত দাঁড় করানো যাবে না। স্বামীর হত্যাকাণ্ড, পরবর্তীতে সন্তানের মৃত্যু চোখের সামনে দেখে, আরেক সন্তানের ওপর নির্মম নির্যাতন দেখেও ধৈর্যহারা হননি, অভীষ্ট লক্ষ্য তথা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন। কতটা মানসিক দৃঢ়তা থাকলে কারাগারে বন্দি থাকতে থাকতে মৃত্যু উপক্রম হওয়ার পরও সংগ্রাম থেকে পিছু পা হননি। প্রাণ যায় যায় অবস্থায়ও সর্বংসহা হয়ে অবিচল থেকেছেন ন্যায়ের পথে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নামে বৃহৎ রাজনৈতিক দলটিকে অহিংস আন্দোলনের পথে পরিচালিত করেছেন। তিনি হারিয়েছেন স্বামী, হারিয়েছেন সন্তান। তাই এই দেশ, এই দেশের মানুষই ছিল তাঁর পরিবার, তাঁর সত্তা, তাঁর অস্তিত্ব। তিনি রেখে গেছেন জনসেবা, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজ আমাদের কাছে স্মৃতি হয়ে গেলেন মরহুম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দিশেহারা বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জনপ্রিয় দলে পরিণত করেছিলেন ৪১ বছর বিএনপি চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পালনকালে কখনও গৃহবন্দি কখনও কারাগারে থেকে আপোষহীননেত্রী হিসাবে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী, দুইবার বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে যিনি জীবনে কোন নির্বাচনে পরাজিত হননি। এশিয়ার প্রথম মুসলিম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী যিনি মেয়েদের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে মেয়েদেরকে শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করেছিলেন। কৃষকের পাঁচ হাজার টাকা কৃষি ঋন মওকুপ ও দশ হাজার টাকার সুদ মহকুফ করেছিলেন, যিনি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয় সৃষ্টি সহ অসংখ্য ভাল কাজ যার মাধ্যমে হয়েছিল সেই প্রিয় নেত্রী আজ স্মৃতি! অকৃত্রিম ভালোবাসায় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠা খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানিয়েছেন দেশ ও বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা। অসীম অনন্তলোকে পাড়ি জমানোর সময় কিছুই নিয়ে যাননি খালেদা জিয়া। কোটি মানুষের ভালোবাসা সঙ্গী করে নিয়ে গেলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। জানাজায় অংশ নেওয়া বহু মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অনেকে হাউমাউ করে কেঁদেছেন। কেউবা নীরবে চোখের পানি মুছেছেন। ১৮ কোটি মানুষকে শোক সাগরে ভাসিয়ে অনন্ত পথের যাত্রী হলেন খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়াকে এ দেশের মানুষ ভুলবে কেমন করে। এ জনপদের প্রতিটি বাঁকে তার হাতের ছোঁয়া রয়েছে। হৃদয়ের সমগ্র ভালোবাসা দিয়ে দেশের মানুষকে আগলে রেখেছেন। বিদেশি শক্তির রক্তচক্ষুর দিকে চোখ রেখে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিশ্বস্ত পাহারাদার ছিলেন। আপস করলে জেলে যেতে হতো না। ক্ষমতা হাতছাড়া হতো না। এই মহাপ্রাণ তো ক্ষমতা চাননি, চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষের সমৃদ্ধি, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেখানো পথে সারাটা জীবন হেঁটেছেন। দেশের মানুষকে ভালোবাসতে গিয়ে সাংসারিক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুখ কী জিনিস তা চোখেও দেখেননি। সব কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। আজ থেকে ৩৩ বছর পূর্বে যে নেত্রীর ,আপোষহীন, বিচক্ষণ নেতৃত্বের প্রতি অনুপ্রাণীত হয়ে জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেছিলাম সেই নেত্রী আজ আমাদের মধ্যে নেই ভাবতে ভীষন কষ্ট লাগে, যার বলিষ্ট নেতৃত্বকে ভালবেসে পবিত্র রমজান মাসে হাসি মুখে কারাবরণ করেছিলাম প্রতিপক্ষ সংগঠনের আক্রমন হুমকি কোন কিছু নিজেকে সঙ্কিত মনে হত না কি যেন এক অলৌকিক সাহস মনের মধ্যে কাজ করত সেই প্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে যেন মহান আল্লাহ উনার প্রিয় বান্দা হিসাবে কবুল করেন আমিন।
লেখকের পরিচিতি: নজরুল ইসলাম খান, সাবেক যুগ্ম সাধারন সম্পাদক লন্ডন মহানগর বিএনপি ও সাবেক কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য যুক্তরাজ্য বিএনপি ও সাবেক ছাত্রনেতা প্রসেসিং রিপ্রেজেন্টিভ ট্রেড ইউনিয়ন (Cwu) লন্ডন

