বোরো ধান রক্ষায় বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহনের দাবী কৃষকদের

মো: মছব্বির আলী: মৌলভীবাজার জেলার হাইলহাওর, কাউয়াদিঘী ও এশিয়ার বৃহত্মম হাওর হাকালুকি হাওরপাড়ের অধিকাংশ কৃষক বোরো ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে সারা বছরের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাই ভালো ফলনের আশায় বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেন তারা।

কিন্তু মৌসুম শেষে সেই স্বপ্নই এখন ভেঙে গেছে অতি বৃষ্টি ও তীব্র শ্রমিক সংকটে। বিভিন্ন মাঠে পাকা সোনালি ধান বৃষ্টির পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও ধান কাটা যাচ্ছে না শ্রমিকের অভাবে, আবার কোথাও কেটে ঘরে তুললেও রোদ না থাকায় শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে ধান। দুই মণ ধানে ক্রয় করতে হচ্ছে একজন শ্রমিককে। এতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। হাকালকি হাওর পাড়ের স্থানীয় কৃষক আব্দুল আহাদ জানান, বর্তমানে এক মণ বোরো ধানের দাম ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা। অর্থাৎ একজন শ্রমিকের একদিনের মজুরি দিতে এক মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে তিন বেলা খাবার, নাশতা ও বিড়ি-সিগারেটের অতিরিক্ত খরচ। আরেক কৃষক আজিজ আহমদ বলেন, গত বছর ৬০০-৭০০ টাকায় শ্রমিক পেয়েছিলাম। এবার খরচ অনেক বেশী। ধানের দাম কম, খরচ বেশি। এভাবে চললে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠবে না। শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তারা বাধ্য হয়েই বেশি মজুরি দাবি করছেন। এদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির কারণে জেলার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় নিচু জমির পাকা ধান ডুবে গেছে। এতে কৃষকের লোকসানের আশঙ্কা আরও বাড়ছে। যেদিন বৃষ্টি থাকেনা সেদিন কৃষকদের মনে আসে পরম স্বস্তির নিংশ্বাস। সবাই ধান মাড়ানি, নিড়ানি কিংবা রোদে ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমন চিত্র কোরবানপুর, সাদিপুর, গৌড়করণ, মহেষগৌরী, চিলারকান্দি, শমারকান্দি, বাদে ভুকশিমইলসহ হাকালুকি হাওর তীরের গ্রামগুলোয়। হাকালুকি হাওরের ধলিয়া বিলে গেলে জয়চন্ডী ইউনিয়নের মীরশংকর গ্রামের মান্নান মিয়া, রইছ আলী, লতিফ মিয়া,  আব্দুল করিম জানান, ৫ দিন আগে ধান কেটে স্তুপ করে  রাখা। মেশিন ছাড়া মাড়াই করার কোন সুযোগ নেই। এমন সময় ধান পানিতে তলিয়ে গেলো যখন মেশিন দিয়ে ধান কাটার সুযোগ ছিলো না। আর ধান কাটার শ্রমিকও মিলছে না। পাকা ধান চোখের  সামনে তলিয়ে যাচ্ছে।  মূলত বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধানের আশা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নাই। শুধু মীরশংকর নয় পার্শ্ববর্তী হাওর তীরের সাদিপুর, কোরবানপুর, গৌড়করণ, ভুকশিমইলসহ সবক’টি গ্রাম ঘুরে কৃষকের সাথে কথা বলে পাওয়া যায় হতাশার চিত্র।  সবার একই কথা, বছরে এক ক্ষেত। এই বোরোধান সারাবছরের খাবার। এবার মনে হয় না খেয়ে  থাকতে হবে। কৃষকদের দাবি, আগাম বন্যায় বোরোধান রক্ষায়  যোন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাহলে হাওর পাড়ের লাখ লাখ মানুষ আর বোরোধান নিয়ে  দু:শ্চিন্তায় পড়বে না।  কুলাউড়া উপজেলা কৃষি অফিস জানায়,  এবার উপজেলায় ৮ হাজার ৭শত ২০ হেক্টর জমিতে বোরোধান আবাদ করা হয়।  এরমধ্যে হাওর এলাকায় ৪ হাজার ৮শত ০৫ হেক্টর।  ভুকশিমইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান,  হাওর তীরসহ তার ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে অর্ধেকের বেশি বোরোধানের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।

কুলাউড়া উপজেলা কৃষি অফিসার মো: জসিম উদ্দিন জানান, হাওর এলাকায় ৯০ ভাগ মানুষ বোরোধান ধান কাটতে সক্ষম হয়েছেন। আর উপরিভাগে ৬৫ ভাগ ধান কাটতে সক্ষম হয়েছেন কৃষকরা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। চোখের সামনে তলিয়ে আছে পাকা ধানের খেত। পানির তলা থেকে যেটুকু ধান কেটে উদ্ধার করা হচ্ছে, তা–ও রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বৃষ্টির কারণে ধান পচে যাচ্ছে, অনেক আঁটিতে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। পচা ধানের গন্ধ আর ফসল হারানো কৃষকদের আহাজারিতে হাওরপারের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের একাধিক প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি ও জমি বন্ধক নিয়ে চাষ করা কৃষকেরা। একাধিক কৃষকের অভিযোগ, শ্রমিক ও নৌকার সংকটের পাশাপাশি মজুরি ও ভাড়া বেশি হওয়ায় পানি থেকে কুড়িয়ে আনা ধানের মূল্যের সঙ্গে খরচের সামঞ্জস্য থাকছে না। পচন ও জালা ধরার অজুহাতে ক্রেতারা ধান কিনতে চাইছেন না; কিনলেও দিচ্ছেন না ন্যায্যমূল্য। তাঁরা এ অবস্থায় ফসল নিয়ে টানাপোড়েনে আছেন। না পারছেন ক্ষেত ফেলে আসতে, না পারছেন তুলতে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের বিরইমাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কিছুটা রোদ উঠতেই কৃষকেরা ধান বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কেউ আধপাকা ধান কেটে তুলনামূলক উঁচু জায়গায় রাখছেন, কেউ নৌকায় করে কাটা ধান সরাচ্ছেন, কেউ ভেজা ধান মাড়াই করছেন। কোথাও স্তূপ করা ধানে পচন ধরেছে, কোথাও আবার পানি উঠে সেই স্তূপ ডুবছে। নৌকার অভাবে অনেকের কাটা ধান পানিতেই পড়ে আছে। কৃষকেরা বলছেন, ৪০-৫০ আঁটি ধান আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আর শ্রমিকের মজুরি ৮৫০ থেকে ৯০০টাকা। ফলে ধান বিক্রি করে খরচই উঠছে না। দুই দিন আগেও যেখানে পানি ছিল না, সেখানে এখন পানি উঠে গেছে।

শুকনা জায়গায় ধানের আঁটি স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। সেখানেও উঠে যায় পানি। রাজনগরের মাথিউরা চা-বাগানের গোপাল নুনিয়া পাঁচ কিয়ার (১৫০ শতক) জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেছিলেন। পানির নিচ থেকে মাত্র ৪ শতক জমির ধান তুলতে পেরেছেন। ঝাড়াই-বাছাই করে পেয়েছেন দুই থেকে তিন মণ ধান। ৬জন শ্রমিক দিয়ে ধান তুলতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৮হাজার টাকা। এর আগে এক কিয়ার জমিতে চাষাবাদেই খরচ হয়েছিল ১০ হাজার টাকার বেশি।

বিরইমাবাদ গ্রামের আবদুল কাদির ১০ কিয়ার জমি বর্গা চাষ করেছিলেন, এর মধ্যে ৬ কিয়ার এখন পানির নিচে। ৪ কিয়ার জমির ধান কাটতে তাঁর খরচ হয়েছে ২৪ হাজার টাকা, কিন্তু বিক্রি করেছেন ২৩ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, ধান অনেকটা পচে গেছে। কেউ নিত চায় না। নিজের ধান তুলতে না পেরে এখন তিনি ১৫০০ টাকায় নৌকা ভাড়া নিয়ে অন্যের ধান পরিবহনের কাজ করছেন। এদিকে কাউয়াদীঘি হাওরের কৃষকের ফসল রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবিতে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে মৌলভীবাজারের হাওর রক্ষা আন্দোলন।

মাঠপর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান মৌলভীবাজারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো: জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত জেলায় ২ হাজার ৩৪৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। কাউয়াদীঘি হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেচ চললেও ভারী বর্ষণের কারণে দ্রুত পানি নামানো যাচ্ছে না। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় মৌলভীবাজারের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে| এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরিস্থিতি ও সরকারি সহায়তা কার্য্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে মঙ্গলবার রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘি হাওর পরিদর্শন করেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল| এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা সঠিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে কিনা তা সরেজমিনে যাচাই করা হয়|

জেলা প্রশাসক হাওরপারের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের বর্তমান পরিস্থিতি, ক্ষয়ক্ষতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা বিষয়ে খোঁজখবর নেন| তিনি কৃষকদের কাছ থেকে পানি বৃদ্ধির কারণ, ফসল রক্ষায় সম্ভাব্য করণীয় এবং ভবিষ্যতে ক্ষতি কমানোর বিষয়ে মতামত শোনেন| পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কিনা তা জানতে চান এবং কারও নাম তালিকায় না এলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন|

পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক কাউয়াদিঘি হাওরের পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম সচল রাখতে পরিচালিত কাশেমপুর পাম্প হাউজ পরিদর্শন করেন| সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পানি নিষ্কাশন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন এবং কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশনা প্রদান করেন| জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হাওরাঞ্চলের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যজীবীদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে| পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে|

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *