সাগর-রুনি হত্যা: ১৩ বছর ধরে বিনাবিচারে কারাগারে বড়লেখার এনাম

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী এনাম আহমেদকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয়। একজন সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতারের পর  তার জীবনের সাড়ে ১৩ বছর কারাগারে কেটে গেলেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাই অবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করেছে তার পরিবার। নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনির ভাই মামলার বাদী নওশের আলম রোমানও চান, এনামকে জামিন দিয়ে মুক্তি দেওয়া হোক এবং তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। নওশের রোমান বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এনামকে জামিন দিয়ে মুক্তি দেওয়া হোক। তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।’

সম্প্রতি এই মামলার সর্বশেষ তদন্ত সংস্থা পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকালে এখন পর্যন্ত এনাম আহমেদের বিরুদ্ধে সাগর-রুনি হত্যায় জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আদালতের আদেশের আলোকে গত ২২ এপ্রিল কাশিমপুর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি কোনো প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। অনেক কিছু মনে করতে পারছিলেন না। তার উত্তরও ছিল এলোমেলো। তদন্ত কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণে তাকে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন বলে মনে হয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন বন্দি থাকার কারণে এনাম বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। তাকে সাধারণ বন্দিদের থেকে আলাদা একটি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার দ্রুত সুচিকিৎসার প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে এনামকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে তাঁর বাবা কালা মিয়াকেও র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ পরিবারের। প্রায় ২১ দিন পর তাঁকে ভৈরবের কাছে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। পরিবারের ভাষ্য, ওই সময় তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল। এরপর আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি কালা মিয়া। শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে প্রায় ছয়-সাত মাস আগে তিনি মারা যান।

একদিকে স্বামীর মৃত্যু, অন্যদিকে ছেলের দীর্ঘ কারাবাস—সব মিলিয়ে ফাতেমা বেগমের পরিবার এখন প্রায় নিঃস্ব।

এনাম আহমেদ মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের পূর্ব-দক্ষিণভাগ গ্রামের মৃত মকবুল আলী ওরফে কালা মিয়ার ছেলে।

এনামের মা ফাতেমা বেগম জানান, তাঁর স্বামীর দক্ষিণভাগ বাজারে একটি ফার্নিচারের দোকান ছিল। আনুমানিক ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি দোকানে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন।

 ‘র‌্যাব পরিচয়ে’ কয়েকজন তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে তোলার পর তাঁর চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর অজ্ঞাত একটি স্থানে নিয়ে গিয়ে তাঁকে নির্যাতন এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছিল বলে কালা মিয়া পরে পরিবারের কাছে জানিয়েছিলেন।

সেদিন স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন ফাতেমা। থানা-পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছিলেন। আত্মীয়স্বজনের কাছেও ছুটেছিলেন। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা-পয়সা খরচ করে স্বামীর সন্ধান করেছিলেন। কিন্তু কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না।

ফাতেমা বলেন, পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর স্বামীকে তুলে নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। প্রায় ২১ দিন পর তাঁকে ভৈরবের কাছে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। যাওয়ার সময় সাথে যে মোবাইল ও নগদ ৮০০ টাকা ছিল তাও সাথে দিয়া গেছে। মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় সেখানকার লোকজন তাকে সিলেটের একটি বাসে তোলে দেন। মোবাইলে খবর দেওয়ার পর ছেলেরা সিলেট কদমতলী বাসষ্ট্যান্ড থেকে বাড়ি নিয়ে আসেন।

তাঁর দাবি, স্বামীকে তখন হুমকি দেওয়া হয়েছিল—তাঁকে তুলে নেওয়া ও নির্যাতনের বিষয়ে কারও কাছে কিছু বললে আবারও তুলে নেওয়া হবে।

চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি মারা যান কালা মিয়া। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর চিকিৎসা চালাতে হয়েছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। ফাতেমার ভাষ্য, স্বামীর চিকিৎসা, সংসারের খরচ এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটে তাঁদের পক্ষে এনামুলের জন্য নিয়মিত আইনগত সহায়তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে যদি দোষী হয়ে থাকে, আমরা তখন তার বিচার চেয়েছিলাম। কিন্তু এত বছর ধরে তদন্ত চলার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ পাওয়া গেল না। শুধু সন্দেহের কারণে আমার ছেলে আর আমাদের পরিবারটাকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা তার মুক্তি চাই।’ সে নির্দোষ হলে তাকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জনিয়েছেন এনামের বড় ভাই শাহিন আহমদ। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/এ/২ নম্বর বাসার একটি ফ্ল্যাট থেকে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক এবং রুনি এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ছিলেন। এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় এ পর্যন্ত ১১২ বার পিছিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *