লাউয়াছড়ায় খাদ্যসংকট-লোকালয়ে আসছে প্রাণীরা

মো: মছব্বির আলী:  লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে খাদ্য সংকট দেখা দেয়ায় প্রায়ই বন ছেড়ে লোকালয়ে ঢুকে মানুষের হাতে ধরা পড়ছে অজগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে গত আগস্ট মাসে ২০টি ও ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। ১ থেকে ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত উদ্ধার করা এসব প্রাণীর মধ্যে ১৭টিই বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। এর বাইরে রয়েছে একটি শঙ্খচিল ও দুটি বানর। সেপ্টেম্বর মাসের ১৯ দিনে উদ্ধার হওয়া ১৩টি প্রাণীর মধ্যে ১১টি সাপ, একটি বনবিড়াল ও একটি হনুমান রয়েছে।

শ্রীমঙ্গলভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল এবং পরিবেশ কর্মী রাজদীপ দেব যৌথভাবে উপজেলার বিভিন্ন বসতঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে অজগর, গোখরা, লজ্জাবতী বানর, ফনিমনসা সাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেন। এছাড়াও আহত ও অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া বেশ কয়েকটি প্রাণীকেও উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়। ‘তারা সেচ্ছায় উদ্ধারকৃত প্রাণীগুলোকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর যথাযথ নিয়মে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন, যাতে সেগুলো নিরাপদ পরিবেশে পুনরায় অবমুক্ত করা যায়। তিনি জানান, ‘বর্তমানে মানুষের বসতি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের দূরত্ব ক্রমেই কমে আসায় প্রায়ই বিভিন্ন প্রাণী লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাণীগুলোকে হত্যা বা ক্ষতি না করে সংশ্লিষ্টদের খবর দিয়ে নিরাপদে উদ্ধার ও প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।’বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্ধার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগস্ট মাসে সবচেয়ে বেশি উদ্ধার করা হয়েছে অজগর। মোট ৯টি অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে উদ্ধার করা একটি অজগর ছিল মৃত। অর্থাৎ জীবিত অজগর উদ্ধার হয়েছে ৮টি। অন্যদিকে, এক দিনে সবচেয়ে বেশি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে ১৫ আগস্ট। ওই দিন শ্রীমঙ্গলের তিনটি পৃথক এলাকা থেকে তিন প্রজাতির তিনটি সাপ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে কৃপণপুর থেকে একটি তক্ষক, লোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল সাপ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে উত্তর ভাড়াউড়া এলাকার মেং বস্তি থেকে একটি লজ্জাবতী বানরও উদ্ধার করে ফাউন্ডেশন। ফলে ওই দিন মোট চারটি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়, যার তিনটিই ছিল সাপ। ফাউন্ডেশনের তালিকা অনুযায়ী, আগস্টে উদ্ধার হওয়া ২০টি বন্যপ্রাণীর মধ্যে অজগর নয়টি, বেত আঁচড়া দুটি এবং শঙ্খিনী সাপ দুটি। এ ছাড়া তক্ষক, দাঁড়াশ সাপ, বিরল সাপ ও সাইবোল্ড ওয়াটার স্নেক একটি করে উদ্ধার করা হয়েছে। সাপের বাইরে রয়েছে একটি শঙ্খচিল, একটি লজ্জাবতী বানর ও একটি উল্টোলেজি বানর। আগস্টের শুরুতেই সাপ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৩ আগস্ট আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে আরও একটি বেত আঁচড়া উদ্ধার করা হয়। ৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি মৃত অজগর উদ্ধারের পর ১৩ আগস্ট ২ নম্বর পুল থেকে এবং ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে আরও দুটি অজগর উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১২ আগস্ট শাহীভাগ থেকে একটি শঙ্খচিল উদ্ধার করা হয়। এরপর ১৫ আগস্ট তিনটি সাপ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। ১৯ আগস্ট মাধের গাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ এবং ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে একটি উল্টোলেজি বানর উদ্ধার করা হয়। ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে আরও একটি শঙ্খিনী সাপ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ২৬ আগস্ট ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান কুঞ্জবন থেকে একটি সাইবোল্ড ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়। মাসের শেষ সপ্তাহেও অজগর উদ্ধারের ঘটনা অব্যাহত ছিল। ২৮ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তির কোয়ার্টার থেকে, ২৯ আগস্ট সাতগাঁও-খিলগাঁও থেকে এবং ৩০ আগস্ট ইছবপুর থেকে একটি করে অজগর উদ্ধার করা হয়।

আগস্ট মাসে উদ্ধার হওয়া ২০টি বন্যপ্রাণীর মধ্যে অজগর নয়টি, বেত আঁচড়া দুটি, শঙ্খিনী সাপ দুটি, তক্ষক একটি, দাঁড়াশ সাপ একটি, বিরল সাপ একটি, সাইবোল্ড ওয়াটার স্নেক একটি, শঙ্খচিল একটি, লজ্জাবতী বানর একটি এবং উল্টোলেজি বানর একটি। সব মিলিয়ে উদ্ধার হয়েছে ২০টি বন্যপ্রাণী, যার মধ্যে ১৭টি সাপ।

সেপ্টেম্বর মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ১৩টি বন্যপ্রাণীর মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল সুশেন্দ্র দেবনাথের কলার আড়তে কলার ছড়ির ভেতর থেকে একটি সবুজ ফণিমনসা সাপ উদ্ধার করা হয়। ২ সেপ্টেম্বর বুধবার সকালে শ্রীমঙ্গল জেটি রোড এলাকার আনোয়ার মিয়ার বাসার ভেতর থেকে একটি বনবিড়ালের বাচ্চা উদ্ধার করা হয়। একই দিনে শ্রীমঙ্গলের রাজাপুর এলাকায় কুকুরের আক্রমণ থেকে আহত অবস্থায় একটি গন্ধগোকুল উদ্ধার করা হয়।

৭ সেপ্টেম্বর সোমবার রাত ৯টায় শ্রীমঙ্গলের চড়ুইগাঁও এলাকার বাবলু দেবের বাসার আঙ্গিনায় একটি পরিত্যক্ত খাদের ভেতর থেকে একটি অজগর সাপ উদ্ধার করা হয়।

৯ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুরে শ্রীমঙ্গল আব্দুল ওহাব উচ্চ বিদ্যালয়, লাহারপুরের পাশের বাড়ি সমর মোদকের বাসায় হাঁস খেতে আসলে একটি বনবিড়াল উদ্ধার করা হয়।

১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে কমলগঞ্জ মডেল স্কুলের পাশে জাপান প্রবাসী মুজাহিদ আলীর বাসার সিঁড়ির নিচ থেকে ৫টি মনোক্লেড কোবরা সাপের বাচ্চা উদ্ধার করা হয়। একই দিন রাতে শ্রীমঙ্গল পূর্বাসা আবাসিক এলাকার পুকুরপাড়ে একটি বসতঘরের দেয়ালের উপর থেকে একটি অজগর সাপ উদ্ধার করা হয়।

১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল ৯টায় শ্রীমঙ্গল ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানে চা শ্রমিকরা চা পাতা তোলার সময় হঠাৎ একটি সাপ দেখতে পান। পরবর্তীতে বিষয়টি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে জানানো হলে তারা এসেেএকটি খৈয়া গোখরা সাপ উদ্ধার করে।

একই দিন বিকেলে শ্রীমঙ্গল ৬নং পুল সংলগ্ন মৌলভীবাজার রোড ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক পারাপারের সময় একটি মুখপোড়া হনুমান সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়। আহত মুখপোড়া হনুমানটিকে উদ্ধার করে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে নিয়েেআসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক হনুমানটিকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৬ সেপ্টেম্বর বুধবার শ্রীমঙ্গলে একটি কলার আড়তে কলার ছড়ির ভেতর ভেতর থেকে খয়েরী ফণিমনসা সাপ উদ্ধার করা হয়।

১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিরাজনগর লামুয়া এলাকায় কদর আলী মেম্বারের বাড়ির আঙ্গিনা থেকে একটি অজগর সাপ উদ্ধার করা হয়।

১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল কালিঘাট পোস্ট অফিস সংলগ্ন কোয়ার্টারে কম্পিউটার অপারেটর উত্তম আচার্যের বাসা থেকে একটি বিষধর পদ্ম গোখরা সাপ উদ্ধার করা হয়।

১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার মধ্যরাতে শ্রীমঙ্গল ইছবপুর এলাকায় মিতালি ডেকোরেটার্স এর মালিক মৃত হারুন মিয়ার বাসার খাটের নিচ থেকে ১৬ ফুট লম্বা বিশাল একটি অজগর সাপ উদ্ধার করা হয়।

একই দিন দুপুরে শ্রীমঙ্গল ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানে চা শ্রমিকরা চা পাতা তোলার সময় হঠাৎ একটি সাপ দেখতে পান। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে খবর দিলে তারা এসে একটি দাঁড়াশ সাপ উদ্ধার করে।

হাওর, ঝোপঝাড়, লেক, উঁচু-নিচু পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল ও চা-বাগানবেষ্টিত শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণীর বিচরণ ও বসবাসের জন্য বৈচিত্র্যময় একটি এলাকা। এর পার্শ্ববর্তী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানও এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। বনাঞ্চল ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বসবাস রয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, বনাঞ্চল ও সংরক্ষিত বনের বিস্তীর্ণ এলাকা এক শ্রেণির সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী দখল করে জনবসতি, বিভিন্ন ধরনের রিসোর্ট ও বাগান তৈরি করছে। এতে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যের সংকটও তৈরি হচ্ছে। ফলে খাদ্যের সন্ধানে বন্যপ্রাণী বাধ্য হয়ে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।

দেশের চিরহরিৎ বনাঞ্চল হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজকের জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের একাংশে অবস্থিত দেশের একমাত্র রেইন ফরেস্ট রিসোর্ট লাউয়াছড়া। ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমি নিয়ে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার মধ্যেবর্তী স্থানে এই লাউয়াছড়া উদ্যানের অবস্থান। লাউয়াছড়ায় ৪৬০ প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, চার প্রজাতির উভচর প্রাণী, ছয় প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং ১৭ প্রজাতির পোকামাকড় রয়েছে। নানান সমস্যা ও সংকটে এখানকার প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যগুলো এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। মানবসৃষ্ট সংকটে ঐতিহ্য ধরে রাখতে হিমশিম খাওয়া এই উদ্যানটি এখন অনেকটাই ধ্বংসের প্রান্তে। তবে চলমান এ সংকট নিরসনে নেই কোনো মহাপরিকল্পনা কিংবা স্থায়ী উদ্যোগ। নানা কারণে দীর্ঘদিনের বয়ে চলা সংকটগুলো ঘনীভূত হয়ে এখন মহা হুমকিতে পড়েছে ওখানকার নানা দুর্লভ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বাসস্থান, জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ। প্রতিনিয়তই খাদ্য, নিরাপদে অবাদ বিচরণ ও বাসস্থানের আয়তন ছোট হচ্ছে ওই সকল বন্যপ্রাণীদের। আর এ কারণেই দিন দিন পরিসংখ্যানও কমছে ওখানে ঠাঁই নেওয়া বিশ্বের বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের।

প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, লাউয়াছড়ায় বন্যপ্রাণী মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে বয়ে চলা সড়ক ও রেল পথকেই দায়ী করছেন! ‘অতিমাত্রায় পর্যটকের আগমন, বনের গভীরে গিয়ে পর্যটকদের হই হুল্লোড়, বনের ভেতরকার সড়ক দিয়ে বেপরোয়া গাড়ি চলাচলের জন্য নিজের আবাসস্থলকে অনিরাপদ ভেবে লোকালয়ে চলে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীরা।’ ‘সচেতনতার অভাবে লোকালয়ে গিয়ে ধরা পড়া বন্যপ্রাণীর একটা বড় অংশই মারা পড়ছে মানুষের হাতে। তবে বন্যপ্রাণী প্রেমি খোকন সিং বলেন, ‘দিন দিন লাউয়াছড়া দখল হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে তারা লোকালয়ে খাদ্যের সন্ধানে গিয়ে ধরা পড়ছে কিছু উদ্ধার হচ্ছে আবার মানুষের হাতেও মারা যাচ্ছে।‘বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্যে ভরপুর এ লাউয়াছড়া বনের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রেলপথ। পাশাপাশি বনের ভেতর দিয়ে রয়েছে সড়কপথও। এ দুই পথে ট্রেন আর গাড়ির চাপায় প্রায় প্রতিনিয়তই মারা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্যপ্রাণী। আহত হচ্ছে আরও বেশি।

বাপার মৌলভীবাজার জেলার সমন্বয়ক আ ন ম সালেহ সুহেল বলেন, ‘একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র নির্বিচারে বনের গাছ উজাড় করায় বন্যপ্রাণীর খাদ্য সংকট চরম আকারে দেখা দিয়েছে। বনের ভেতরে পর্যটকদের গাড়ি চলাচল উচ্চ শব্দে মাইক বাঝানোসহ বনের গভীরে পর্যটকদের আনাগোনা বন্ধ করা প্রয়োজন। এছাড়া বনের গা ঘেঁষে, অনেক ক্ষেত্রে বনের জমি দখল করে লেবু বাগান, ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ, পর্যটকদের বনের ভেতর অবাধে প্রবেশ করে হই-হুল্লোড় ও বনের ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচলের কারণেও প্রাণীদের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।‘

কমলগঞ্জের সাংবাদিক প্রণীত রঞ্জন দেবনাথ বলেন, বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে আসতে চায় না, আমরাই দিনের পর দিন বন-জঙ্গল ধ্বংস করে তাদের আবাসস্থল দখল করে ব্যাক্তি স্বার্থে নিজেদের জন্য আবাস গড়ছি। শুধু তাই নয় লাউয়াছড়ার বনের ভেতরে বনে জায়গা দখল করে প্রচুর লেবু ও আনারস বাগান গড়ে উঠেছে। এসব বাগানে আবার ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন বিষাক্ত কেমিকেলও ফলে লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ছড়ার পানিতে এসব বিষাক্ত কেমিকেল পানির সঙ্গে মিশে দূষিত হচ্ছে। এসব ছড়ার পানি পান করেও অনেক প্রাণী মারা যাচ্ছে। আর প্রতিনিয়তই একশ্রেণির প্রভাবশালীদের দখলের কারণে বন্যপ্রাণীদের আবাস্থল সংকুচিত হচ্ছে পাশাপাশি দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট।’বনের গাছ কেটে পাচারের ফলে তাদের আবাস ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে তারা প্রায়শই খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে চলে যাচ্ছে। নিজেদের প্রয়োজনেই এসব বন্যপ্রাণী ও বন আমাদের রক্ষা করা প্রয়োজন। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় এখনো মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে সচেতনতা তৈরি হয়নি। ফলে লোকালয়ে আসা বন্যপ্রাণীকে অনেকেই সচেতনতার অভাবে হত্যা করছে। লাউয়াছড়া বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় গণমাধ্যমকর্মীসহ স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুতই সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

বন বিভাগের হিসাবমতে, লাউয়াছড়া বনে ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ (৩৯ প্রজাতির সাপ, ১৮ প্রজাতির লিজার্ড ও দুই প্রজাতির কচ্ছপ), ২২ প্রজাতির উভচর, ২৪৬ প্রজাতির পাখি ও অসংখ্য কীট-পতঙ্গ রয়েছে। বিরল প্রজাতির উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান ও চশমাপরা হনুমানও দেখা যায় সংরক্ষিত এ বনে। এর বাইরেও রয়েছে বানর, মেছোবাঘ, বন্য কুকুর, ভালুক, মায়া হরিণ, বনছাগল, কচ্ছপ, অজগরসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। পাখির মধ্যে আছে সবুজ ঘুঘু, বনমোরগ, মথুরা, তুর্কি বাজ, সাদা ভ্রু সাতভায়ালা, ঈগল, হরিয়াল, কালো মাথা টিয়া, কালো ফর্কটেইল, ধূসর সাতশৈলী, পেঁচা, ফিঙে, লেজ কাটা টিয়া, কালোবাজ, হীরামন, কালো মাথা বুলবুল ও ধুমকল। সাধারণ দর্শনীয় পাখির মধ্যে উল্লেখযোগ্য টিয়া, ছোট হরিয়াল, সবুজ সুইচোরা, তোতা, ছোট ফিঙে, সবুজ কোকিল, পাঙ্গা ও কেশরাজ। বিপন্ন ও বিরল প্রজাতির অনেকগুলোর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা। বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া রেলপথ ও সড়কপথকেই বন্যপ্রাণীর জন্য মরণফাঁদ হিসেবে মনে করেন বন্যপ্রাণীপ্রেমী এবং ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার খোকন সিং। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বনের মধ্য থেকে সড়ক ও রেলপথ স্থানান্তরের দাবি জানিয়ে আসছে সচেতন মহল। এগুলো স্থানান্তর করা না গেলে কোনোভাবেই বন্যপ্রাণী রক্ষা করা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *