সেনা সদস্য কামরুলের সহায়তায় বাড়ী  ফিরলেন পথহারা বৃদ্ধা কইতরুনন্নেছা

মাহফুজ শাকিল : কইতরুন্নেছা (৬৮) স্বামী পরিত্যক্তা একজন বৃদ্ধা নারী। মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ নিঃসন্তান ওই বৃদ্ধা নারী থাকেন বাবার বাড়িতে। মাঝেমধ্যে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে চলে যান। কয়েকদিন পর আবার ফিরেও আসেন। এভাবে তিনি গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহে পরিবারের কাউকে কোন কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। প্রায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় তাঁর কোন খোঁজ মিলেনি। গত ৯ জুলাই শাহাবউদ্দিন নামে ওই বৃদ্ধার এক নাতি ফেসবুকে ছবি দেখে তাঁর দাদীকে  চিনতে পারেন। তিনি মাদারীপুর অবস্থান করছেন। সেখানে বৃষ্টিতে ভিজে স্থানীয় টেকেরহাট পাবলিক স্কুল এ্যান্ড কলেজে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ওই প্রতিষ্ঠানে সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে। ওইখানে বৃদ্ধা কইতরুন্নেছাকে বৃষ্টি ভেজা অবস্থায় দেখে কাছে যান সৈয়দ কামরুল ইসলাম সৌরভ (২৩) নামে এক সেনা সদস্য। তিনি তাঁকে উদ্ধার করে সেবা যতœ করেন।

বৃদ্ধার কাছ থেকে তাঁর পরিচয় জেনে সেনা সদস্য কামরুল ইসলাম গত ৯ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। সেই পোস্টের সূত্র ধরে ওই বৃদ্ধার নাতি শাহাব উদ্দিন শিহাব তাঁর খোঁজ পান। বৃদ্ধার বাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের কর্মধা গ্রামে। বিয়ে হয় কর্মধার মুরইছড়া এলাকায় এক ব্যক্তির সাথে। বিয়ের তিন-চার বছর পর স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে তিনি সেখান থেকে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। এরপর বাবার বাড়িতে তিনি স্বজনদের সাথে জীবনযাপন করছেন।

১০ জুলাই  বৃহস্পতিবার বিকেলে সেনা সদস্য কামরুল ইসলাম বৃদ্ধাকে নিয়ে কুলাউড়ায় এসে তাঁর স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেন। বিকেল পাঁচটার দিকে কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদে বৃদ্ধা কইতরুন্নেছাকে তাঁর ভাইপো উম্মর আলী ও নাতি শাহাবউদ্দিন শিহাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এসময় কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হেলাল আহমদ, কুলাউড়া থানার এসআই মুহিত মিয়া, কর্মধা  ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সদস্য, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সেনা সদস্য সৈয়দ কামরুল ইসলামের বাড়ি কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নে। তিনি ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত সৈয়দ আব্দুল জব্বারের ছেলে। তিনি পাঁচ বছর ধরে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে কর্মরত আছেন। বর্তমানে তিনি বরিশাল সেনানিবাসে কর্মরত রয়েছেন।

এক প্রতিক্রিয়ায় সেনা সদস্য কামরুল ইসলাম বলেন, গত ৯ জুলাই সকাল থেকেই অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল। বিকেলে বৃদ্ধা কইতরুন্নেছা ভিজে আমাদের সেনা ক্যাম্পের বারান্দায় এসে উঠেন। কথা বলার সময় বৃদ্ধাকে কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন মনে হয়েছিল। ওই বৃদ্ধা আশপাশে রেল স্টেশন আছে কি না জানতে চান। একপর্যায়ে তাঁর বিস্তারিত পরিচয় দেন আমাকে। তবে, বৃদ্ধা নারী কীভাবে মাদারীপুরে এসেছেন তা তিনি সঠিকভাবে বলতে পারেননি। অনেক ক্ষুধার্ত থাকায় বৃদ্ধাকে সেনা ক্যাম্পের ভেতরে নিয়ে খাবারসহ নাস্তা করাই। এরপর তাঁর ছবি তুলে পরিচয় শনাক্তের জন্য আমার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলে ওই বৃদ্ধার নাতি শাহাবুদ্দিন নামের এক তরুণ আমার সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি পোস্টে দেওয়া ছবি তাঁর দাদির বলে জানান। একপর্যায়ে বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে কর্তৃপক্ষ ওই বৃদ্ধাকে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দিতে আমাকে তিন দিনের ছুটি প্রদান করেন। বুধবার রাতে বৃদ্ধাকে নিয়ে বাসযোগে করে কুলাউড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেই।

সৈয়দ কামরুল ইসলাম আরো বলেন, ওই বৃদ্ধা নারী কিভাবে মাদারীপুরে এসেছেন। তিনি জানালেন, কুলাউড়া রেল স্টেশন থেকে ট্রেনে করে প্রথমে ঢাকা, এর পর ঢাকা থেকে ভাঙায় চলে যেতে পারেন। ভাঙা থেকে সেনা ক্যাম্পের দূরত্ব ১৫-২০ কিলোমিটার। বাড়ি ফেরার জন্য তিনি রেল স্টেশন খোঁজছিলেন। আমি রীতিমত অবাক হলাম, এতো দূর থেকে তিনি কিভাবে এখানে এলেন। আমার পাশের ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার নাম বললে তিনি চিনতে পারেন। তখন মনে হলো উনার বাড়ি কুলাউড়ায় হবেই, তাই চিনতে পেরেছি। বৃদ্ধা নারীকে তার স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি এটাই আমার স্বার্থকতা। পরিবারের সদস্যদের বলেছি, তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে, তাঁকে যেন সবসময় নজরদারিতে রাখতে। তিনি আরো বলেন, আমি সেনা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে অনেক কৃতজ্ঞ যে, এই মানবিক কাজে আমাকে সহযোগিতা করার জন্য।

কইতরুন্নেছার নাতি, কুলাউড়া সরকারি কলেজের ছাত্র শাহাব উদ্দিন শিহাব বলেন, আমার দাদী প্রায়শই পরিবারের কাউকে না জানিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে চলে যান। আবার কয়েকদিন ঘুরাঘুরি করে ফের বাড়িতে আসেন। গত ১৫-২০ দিন আগে বাড়ি থেকে বের হলে তিনি আর বাড়ি ফিরেননি। আমরা মনে করেছি, আগের মতো তিনি বাড়ি ফিরে আসবেন এজন্য আর খোঁজ করিনি। উনার খোঁজ না পেয়ে আমরা অনেক চিন্তায় পড়ে যাই। তবে দুশ্চিন্তা দূর হয় যখন সেনা সদস্য কামরুল ইসলামের ফেসবুক পোস্টের সূত্রে আমার দাদির সন্ধান পাই। দাদিকে ফিরে পেয়ে আমরা অনেক খুশি। সেনা সদস্য কামরুল ইসলাম নিজে দায়িত্ব নিয়ে মহানুভবতা দেখালেন সেজন্য তাঁর প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা জানাই।

স্থানীয় কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হেলাল আহমদ বলেন, সেনা সদস্য কামরুল ইসলামের মানবিক এ কাজটি মানবতার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাঁর দৃষ্টিতে না পড়লে হয়তো বৃদ্ধা কইতরুন্নেছার সন্ধান পাওয়া কঠিন ছিল। এ মানবিক কাজের জন্য সেনা সদস্য কামরুল ইসলামকে তিনি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *