জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার:
কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর শিববাড়ীকে বলা হয় সিলেটের সবচেয়ে সুন্দর এবং দৃষ্টিনন্দন মন্দির। প্রায় ১৫০ বছরের পরিক্রমায় এই বছরও এই শিববাড়ীতে অনুষ্ঠিত হবে দুর্গাপূজা। প্রাচীন কারুকার্যময় মন্দিরের স্থাপত্য শৈলী এক অপরূপ নিদর্শন কাদিপুর শিববাড়ি যা আকর্ষণ বাড়ায় সবার মনে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। পাঁচদিন ব্যাপী ওই উৎসবের শেষ হবে আগামী ২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। ২০২২ সাল থেকে শিববাড়িতে ২৩ ফুট উঁচু সহ¯্রভুজা (এক হাজার হাতের) দুর্গা প্রতিমার পূজা চলছে। এবারও এক হাজার হাতের প্রতিমা এ মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ। অনিন্দ্য সুন্দর এই শিবাবাড়িতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখানে প্রতিমা দর্শন করতে আসেন।
কুলাউড়ার শিবাবাড়ি সহ উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের বিভিন্ন মন্দির পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কুলাউড়া সার্কেল) মো. আজমল হোসেন, কুলাউড়া থানার ওসি মো. ওমর ফারুকসহ সরকারের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সরেজমিনে শিববাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শিববাড়ির সৌন্দর্য রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রবেশমুখে থেকে বাড়ির ভেতর পর্যন্ত পাকা সাদৃশ্য একাধিক তোরণ রয়েছে। বাড়ির ভেতরে পাশাপাশি তিনটি মন্দির। ‘আনন্দ সেবাধাম’ নামের মন্দিরের দোতলায় ২০২২ সালে লাল রং দিয়ে এক হাজার হাতের দুর্গা প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছিল। সিমেন্টের তৈরি এই প্রতিমার উচ্চতা ২৩ ফুট। এরপর ২০২৩ সালে নতুন করে বড় দুটি মন্দিরের মাঝখানে তৈরি করা হয় “ শ্রী শ্রী ভৈরবী মা” নামে আরেকটি মন্দির। গতবছরের মতো এবারও শ্রী শ্রী ভৈরবী মা মন্দিরের উপরে মানসী পূজাও করতে পারবেন পূজারীরা।
শিববাড়ির বাসিন্দা আচার্য্য পুলক সোম বলেন, প্রখ্যাত বেতার সম্প্রচারক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র চন্ডী পাঠের সময় দেবী দুর্গাকে কখনো দশভুজা, কখনো অষ্টাদশভুজা আবার কখনো সহ সহস্রভুজা উল্লেখ করেছেন। মহিষাসুর বধের সময় দেবী যে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন, তাতেও তিনি সহস্রভুজা ছিলেন। তাই লাল রং দিয়ে সহস্রভুজা দুর্গা প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। এটা চলবে প্রতিবছর। তবে প্রতিমার বিসর্জন হবেনা। পুলক সোম আরো বলেন, রং তুলির ছোয়া প্রায় শেষ হয়েছে, পূজার সময় এগিয়ে আসছে। এবার রাত ১২টার পর প্রধান ফটক বন্ধ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সবার সহযোগিতায় এবারও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পূজা উদযাপন করা হবে। নিরাপত্তার জন্য শিববাড়ির বিভিন্ন স্থানে একাধিক সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, এই বাড়ির স্বর্গীয় অনঙ্গ কুমার সোম ছিলেন জমিদার বংশের। এই বংশের কোন এক বংশধর তাঁদের দীঘিরপাড়ে বেলগাছের নিচে নিয়মিত শিবের সাধনা করতেন। সাধনা করলেও তখনো এ বাড়িতে কোন শিবলিঙ্গ ছিলনা। তাঁদের কুলদেবতা হচ্ছেন কানাই লাল (রাধাকৃষ্ণ)। পূর্বপুরুষগণ সম্পত্তির অনেকটা দেবত্তর করে দিয়েছিলেন কুলদেবতার নামে। পরে অনঙ্গ কুমার সোমের পুত্র স্বর্গীয় অজিত কুমার সোমের পরবর্তী বংশধর পুলক সোমের সাধনায় ১৪০৫ বঙ্গাব্দে (১৯৯৮ খ্রিঃ) শ্রাবণের ১৮ তারিখ শিবলিঙ্গটি পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় সেই শিবলিঙ্গটি ১৫০ বছর পূর্বেকার। পরে পুরনো মন্দিরটি সংস্কার করে সেখানেই শিবলিঙ্গটি স্থাপন করা হয়। শুরু হয় প্রতি সোমবারে সোমনাথ (শিব) পূজা। আসতে শুরু করেন ভক্তগণ। নিজেদের প্রার্থনা জানিয়ে শিবের পূজা শুরু হলে মন্দিরের উন্নয়নও শুরু হয় ভক্তদের আর্থিক সহায়তায়। তৈরি হয় অপূর্ব কারুকার্যমন্ডিত মন্দির। যা ভক্তদেরকে আকৃষ্ট করে। ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত।
জানা যায়, শিববাড়ির পূর্বপুরুষদের জমিদারী প্রথার বিলুপ্তি ঘটলে একসময়ের দোর্দন্ড প্রতাপশালী জমিদার পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পরে। ফলে প্রায় ৩১ বৎসর দেবী দুর্গার ঘটপুজা তারা করেন। তখন সেই বনেদী পূজা-পার্বণে আকাশছোঁয়া জৌলুস হারিয়ে গেলেও তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে একবিন্দু ঘাটতি পড়েনি। পরবর্তীতে ২০০১ সালে জমিদারী বাড়ির মন্দিরটি জৌলুস ফিরতে শুরু করে, যা এখনও চলছে। প্রতিবছর দুর্গাপূজায় লাখো ভক্তদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠে অনিন্দ্যসুন্দর এ মন্দিরটি।
কুলাউড়া উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহবায়ক বিধান দেব বলেন, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সর্বজনীনসহ মোট ২২১ টি মন্ডপে এবার শারদীয় দুর্গোৎসব হচ্ছে। এর মধ্যে শিববাড়িতে ভক্তদের সমাগম হয় সবেচেয়ে বেশি। শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপন করতে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবধরণের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক বলেন, উপজেলায় মোট ২২১ টি মন্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপনে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে বিট পুলিশিং, সর্বদলীয় নিরাপত্তা কমিটি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সম্প্রীতি সমাবেশ করা হয়েছে। সবক’টি পূজা মন্দির পরিদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া পূজাকে কেন্দ্র করে যেকোন ধরণের গুজব রোধে সবাই পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহবান জানাচ্ছি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, সিলেটের সর্ববৃহৎ কুলাউড়ার শিববাড়ি মন্দিরসহ উপজেলার প্রতিটি মন্ডপে দূর্গাপূজায় সর্বশেষ প্রস্তুতি খুবই সন্তোষজনক। অন্যান্য বছরের ন্যায় এবছরও আরো বেশি উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপন হবে। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার বাহিনী সম্মিলিতভাবে কাজ করছে।

