কুলাউড়া প্রতিনিধি : কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের হাকালুকি হাওরে নৌকা ডুবিতে নিখোঁজের ৫ ঘন্টা পর জাহিদুল হক সিদ্দিকী তানিম (১৯) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থীর লাশ সোমবার রাতে উদ্ধার করেছে এলাকাবাসী। সোমবার বিকেল সাড়ে চারটায় ভাটেরা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের শাহমীর-হরিপুর এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে এই ঘটনাটি ঘটে। মৃত্যুর আগে নিহত তানিম তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক টাইমলাইনে একটি স্ট্যাটাস দেয়। যেটি নিয়ে এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পাঠকদের জন্য তানিমের দেয়া স্ট্যাটাসটি হুবুহ তুরে ধরা হলো- “তুমি মানুষরে হুমকি দেও ভাটেরায় উঠতে দিতানা? আমরা যদি চাই তুমি কিতা ভাটেরায় উঠতে পারবা নি? দয়া করে জানাও তুমি কই আছো? সিলেট নাকি ঢাকায়? গায়েব করতে সময় লাগবে না? তুমি কতো বড় মাফের মাস্তান হইছো আর তোমার হিম্মত যদি থাকে তুমি কই আছো আমারে জানাও। তুমি যাদের হুমকি দিরা ম্যাসেঞ্জারে তারার গেছে ক্ষমা না চাইলে তোমার পরিনিতি খুব ভয়ানক হবে। অপরাধ যেকটা করছো তা নিয়া মাথাব্যথা নাই আমরার, কিন্তু মানুষরে হুমকি দিরা তা নিয়া মাথা ব্যথা আছে মাইন্ড ইট” । তাঁর দেয়া এই রহস্যময় স্ট্যাটাসটি নিয়ে স্থানীয় ভাটেরা এলাকাসহ কুলাউড়ায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই এই স্ট্যাটাসটিকে নিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন সমালোচনা করছেন এবং আইনপ্রয়োগ কারী সংস্থাকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। এদিকে মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় নিহত তানিমের জানাযার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
স্থানীয় এলাকার বাসিন্দারা জানান, নিহত তানিমসহ ৮ জন নৌকা যোগে বিকেল ৩টা ত্রিশ মিনিটে ভাটেরার হরিপুর এলাকা থেকে শাহমীর এলাকায় একটি বাড়িতে শিরণী খেতে যান। সেখান থেকে বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে ফেরার পথে শাহমীর- হরিপুর এলাকার মধ্যখানে নৌকাটি ডুবে যায়। এসময় সবাই সাঁতার কেটে তীরে ফিরলেও তানিম ডুবে গিয়ে নিখোঁজ হন। পরে এলাকাবাসী অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাত পৌনে ১০ টায় তার লাশটি উদ্ধার করে। নিহত তানিম বরমচাল ইউনিয়নের ইটাখলা গ্রামের তাজুল মিয়ার ছেলে। সে ভাটেরা স্কুল এন্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তো। সে কলেজে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। পরিবারে এক ভাই এক বোনের মধ্যে তানিম ২য়।
নৌকায় তানিমের সাথে থাকা তার সম্পর্কে চাচা শাহেদ সিদ্দিকী মুঠোফোনে বলেন, আমরা নৌকায় ৮জন ছিলাম। শাহমীর এলাকায় আমাদের পুরাতন বাড়িতে একটি শিরনী অনুষ্ঠানে আমরা বিকেলে রওয়ানা দেই। সেখান থেকে ফেরার পথে অর্ধেক রাস্তায় আসার পর তীব্র বাতাসে নৌকাটি উল্টে যায়। উভয়পাশেই তীরের দূরত্ব অনেক দূর ছিল। প্রায় ৩০০ হাত দূরে একটি ব্রীজ থাকায় নৌকায় যারা ছিল তাদের মধ্যে তানিমসহ ৪জন সাতার কেঁটে ব্রীজের দিকে এগোচ্ছিলো। পেছনে আমরা ৪জন ছিলাম। এরমধ্যে আমরা ভাগ্নে বেলাল সিদ্দিকী হঠাৎ বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার দেয় তখন আমি পেছন থেকে সাথে থাকা দুইজনকে নিয়ে বেলালকে উদ্ধার করে ব্রীজের ওপর নিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে
দেখি তানিমের সাথে থাকা চারজনের মধ্যে তিনজন ব্রীজের পাশে ক্লান্ত-দুর্বল হয়ে পড়ে আছেন কিন্তু তানিমকে ওইসময় পাওয়া যায়নি। তখনই সাথে সাথে আমরা চিৎকার দিয়ে তানিমের খোঁজ শুরু করি। পরে এলাকার আরো অনেক লোকজন তাদের নৌকা নিয়ে তানিমকে খুঁজতে সহযোগিতা করে। একপর্যায়ে রাত পৌনে দশটার দিকে তানিমকে উদ্ধার করা হয়। আর ফেসবুকে স্ট্যাটাস প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর মৃত্যুর সাথে ফেসবুক স্ট্যাটাসের কোন সম্পর্ক নেই। স্ট্যাটাসটি তার পারিবারিক বিষয় নিয়ে।
নিহত তানিমের মা সালমা বেগম মুঠোফোনে হাউমাউ করে কেঁদে বলেন, বিকেলে শিরনীতে যাওয়ার জন্য কে বা কারা ফোন দিয়ে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। বিকেলে শিরনী থেকে ফেরার পথে নৌকা ডুবে আমার ছেলে মারা গেছে বলে আমাদের জানানো হয়। আমি আমার ছেলের এই মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিনা। তাদের ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে আমার ছেলে না গেলে সে মারা যেত না।
ভাটেরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ একেএম নজরুল ইসলাম বলেন, লাশটি এলাকাবাসী উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যান। ধারণা করা হচ্ছে, নৌকায় থাকা ছেলেগুলো ফেরার পথে খুবই হুই হুল্লোড় করছিল। আবহাওয়া খারাপ ছিল তাই নৌকাটি উল্টে যায়। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে সহপাঠী ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কুলাউড়া থানার ওসি (তদন্ত) মো. আমিনুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিনা ময়নাতদন্তে নিহতের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হবে। নিহত তানিমের মৃত্যুর পূর্বে ফেসবুকে রহস্যময় স্ট্যাটাস দেয়া প্রসঙ্গে পুলিশের এ কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নৌকা ডুবিতে তানিমের মৃত্যুর সাথে ফেসবুক স্ট্যাটাসের কোন সম্পর্ক নেই।

