জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার:
জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি কুলাউড়া উপজেলা শাখার কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করেন সংগঠনের জেলা সভাপতি। কিন্তু নতুন কমিটিতে নির্বাচিত কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে বাদ দেওয়ায় দলের একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এতে নতুন করে দলের মধ্যে দুটি গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছে। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহুর্তে কুলাউড়া বিএনপির রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ এখন প্রকাশ্য এসেছে। কয়েকদিন ধরেই সরগরম হয়েছে কুলাউড়া বিএনপির রাজনীতির মাঠ।
দলের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা পৃথকভাবে সরকার বিরোধী আন্দোলন-কর্মসূচি পালন করছেন। এসব কর্মসূচিতে দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা একে অপরকে কটাক্ষ করে নানা সমালোচনা করছে। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্য, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ব মুহুর্তে দলের দুই গ্রুপের নেতাদের এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হবে দলেরই। এমন পরিস্থিতিতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন নেতাকর্মীরা।
এদিকে গত ১৯ আগস্ট উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির উদ্যোগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সরকার বিরোধী একদফা আন্দোলনকে বেগমান করার লক্ষ্যে কুলাউড়ার একটি কমিউনিটি সেন্টারে ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির আহবায়ক ও জেলা সহ-সভাপতি আশিক মোশারফের সভাপতিত্বে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এসময় বক্তব্য রাখেন। এসময় নেতারা পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের সমালোচনা করে বলেন, জেলা সভাপতি নাসের রহমানের নেতৃত্বেই মৌলভীবাজারের বিএনপি চলবে। এখানে অন্য কোন নেতা নেই। ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভা করে আহবায়ক কমিটি উপজেলার ১৩ ইউনিয়নে নতুন আহবায়ক কমিটি ও দুটি ইউনিয়নে সম্মেলন করে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে বিলুপ্ত উপজেলা কমিটির পক্ষ থেকে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে গত ১৮ আগস্ট বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার দাবিতে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এর নামে চক্রান্তমূলক মামলায় অন্যায় রায়ের প্রতিবাদে সংগঠনের জেলা কমিটির সহ-সভাপতি এড. আবেদ রাজার নেতৃত্বে কুলাউড়া পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দরা। এসময় আবেদ রাজা নতুন আহবায়ক কমিটির সমালোচনা করে জেলা সভাপতি নাসের রহমানকে উদ্দেশ্যে করে প্রশ্ন ছুঁড়েন। তিনি বলেন, ‘আপনাকে এককভাবে কুলাউড়া বিএনপির কমিটি ভাঙ্গার অধিকার কে দিয়েছে? কোন সাহসে মৌলভীবাজারের দুই ভাড়াটে (আহবায়ক ও যুগ্ম আহবায়ক) এনে কুলাউড়া কমিটির শাসনভারে বসালেন?
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৯ সালে উপজেলা বিএনপির ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল হয়। কাউন্সিলে নেতা-কর্মীদের ভোটে জয়নাল আবেদীন বাচ্চু সভাপতি, বদরুজ্জামান সজল সাধারণ সম্পাদক ও সুফিয়ান আহমদ সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেই কাউন্সিলে উপস্থিত ছিলেন জেলা সভাপতি নাসের রহমান। সম্প্রতি এ কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় গত ৩১ জুলাই জেলা বিএনপির সভাপতি এম নাসের রহমান কাউকে না জানিয়ে উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত করেন। এরপর গত ৬ আগস্ট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আশিক মোশারফকে আহবায়ক, সাংগঠনিক সম্পাদক বকশী মিসবাউর রহমানকে যুগ্ম আহবায়ক, সহ-সভাপতি এড. আবেদ রাজাকে ১ম সদস্য ও শওকতুল ইসলাম শকুকে ২য় সদস্য করে বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি/সম্পাদকসহ ৩৭ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি গঠন ঘোষণা করেন জেলা সভাপতি। আহবায়ক কমিটিতে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই জেলা সভাপতি নাসের রহমান বলয়ের নেতাকর্মী। এ কমিটি ঘোষণার পর সংগঠনের একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি ঘোষণার দাবি জানিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল ও সাংগঠনিক সম্পাদক সুফিয়ান আহমদ স্বাক্ষরিত একটি আবেদন গত ১০ আগস্ট বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে দেয়া হয়। পরবর্তীতে দলের মহাসচিব বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদককে নির্দেশনা প্রদান করেন।
লিখিত ওই আবেদনে বলা হয়, সংগঠনের জেলা সভাপতি এম নাসের রহমান সংগঠনের জেলা সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য নেতাদের সাথে কোন আলোচনা ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠন করেছেন। এতে দলের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টি হয়েছে। যার প্রতিক্রিয়ায় কুলাউড়ার সর্বস্তরের বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানান।
যুক্তরাজ্যে থেকে বিএনপি নেতা তপন চৌধুরী তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেন, উপজেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটিতে প্রাক্তণ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদককে না রাখায় ঘোষিত কমিটিকে বিতর্কিত করবে এতে গ্রুপিং বাড়বে কমবেনা।
গফ্ফার চৌধুরী নামে এক বিএনপি নেতা ফেসবুকে লিখেন, কুলাউড়া উপজেলা বিএনপি কি এতটাই দেউলিয়া হয়ে গেছে, মৌলভীবাজার থেকে আহবায়ক ও যুগ্ম আহবায়ক দিতে হবে।
উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য ও কাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আব্দুল মোহিত বাবলু বলেন, সংগঠনের জেলা সভাপতির এখতিয়ার আছে উপজেলা কমিটি ভাঙ্গার এবং আহবায়ক কমিটি করার। কিন্তু বিলুপ্ত কমিটি এখন দাবি করছে তারা বহাল ও বৈধ। তাহলে তারা কিভাবে বিভিন্ন ইউনিয়নের পূর্বের কমিটি রেখে নতুন কমিটি করছেন। আমাদের আহবায়ক কমিটি থেকে উপজেলার ১৩ ইউনিয়নে আহবায়ক কমিটি দেয়া হয়েছে এবং উপজেলার জয়চন্ডী ও ভূকশিমইল ইউনিয়নের সম্মেলন করে কমিটি করা হয়েছে।
কুলাউড়া বিএনপির আহবায়ক আশিক মোশারফ বলেন, জেলা বিএনপির সভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমাকে কুলাউড়া বিএনপির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন। আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমি আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবো। আপনি মৌলভীবাজার জেলা শহরের বাসিন্দা সেই ক্ষেত্রে কুলাউড়া বিএনপির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কারণ কি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গঠনতন্ত্রে এমন কোন উল্লেখ নেই। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো বেগমান করতে সাময়িক সময়ের জন্য শুধু ইউনিয়ন ও উপজেলা বিএনপির সম্মেলন পর্যন্ত আহবায়কের দায়িত্ব পালন করবো।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান বলেন, কুলাউড়া উপজেলা বিএনপির নির্বাচিত একটি কমিটি রয়েছে। জেলা সভাপতি ও আমি যৌথ স্বাক্ষরে এ কমিটি অনুমোদন দেই। কমিটি বিলুপ্ত করতে হলে জেলা কমিটির সভা ডাকার দরকার ছিল। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে উপজেলা কমিটি করতে হবে। অথচ আমার সঙ্গে কোন আলোচনা না করেই জেলা সভাপতি এককভাবে কুলাউড়া বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। তাই এ কমিটির কোন বৈধতা নেই। আমি নির্বাচিত কমিটির সাথে আছি।
এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সভাপতি এম নাসের রহমান বলেন, কুলাউড়ার কমিটি নিয়ে আমি কোন কথা বলতে চাই না, আমাদের দলের লোকদের সাথে কথা বলেন বলে তিনি ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন রোববার দুপুরে মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, সংগঠনের মহাসচিবের কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়ে অভিযোগের তদন্ত করি। মহাসচিব বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন তিনি আসলে প্রতিবেদন জমা দিবো। আশা করি তাঁর হস্তক্ষেপে কমিটি নিয়ে কুলাউড়া বিএনপির সৃষ্ট বিরোধের সুন্দর একটি সমাধান হবে। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থানীয়ভাবে বিএনপির দুটি গ্রুপের বিরোধ কোন প্রভাব পড়বে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে আমাদের চিন্তাই নেই, আমাদের অভিধানে নির্বাচন নেই, আমরা এখন দল নিয়ে কাজ করছি। জেলা থেকে আহবায়ক-যুগ্ম আহবায়ক নিয়ে কুলাউড়ার আহবায়ক কমিটি গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণত যে এলাকার লোক সেখানকার লোক দিয়ে কমিটি দিতে হবে। তবে উর্দ্ধতন কমিটি থেকে দায়িত্ব দেয়া যায় না এমন কোন কথা নেই।

