মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: সারাদেশের ন্যায় বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আজ রোববার শেষ হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। রোববার সকালে দর্পণ-বিসর্জনের মাধ্যমে বিদায় জানানো হয় দেবী দুর্গাকে। এরপর বিকেল ৪টা থেকে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি, কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দেওয়াই মূলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এ প্রবৃত্তিগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।
চণ্ডীপাঠ, বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে ষষ্ঠী তিথিতে “আনন্দময়ীর” আগমনে গত ৯ অক্টোবর থেকে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। পরবর্তী ৫ দিন ঢাকাসহ দেশব্যাপী পূজামণ্ডপগুলোতে পূজা-অর্চনার মধ্যদিয়ে ভক্তরা দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের শেষ হয়।
এ বছর দেবী দুর্গার আগমন হয় দোলায় বা পালকিতে। দেবীর এই আগমনের ফলাফল হবে মড়ক। যা শুভ ইঙ্গিত নয়। এছাড়াও দেবী স্বর্গে গমন করবেন ঘোটকে বা ঘোড়ায়। শাস্ত্রমতে দেবীর গমন বা আগমন ঘোটকে হলে ফলাফল ছত্রভঙ্গ হয়। শাস্ত্রমতে এই ঘোটকে গমনের ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খল অবস্থাকে ইঙ্গিত করে। এটি যুদ্ধ, বিগ্রহ, অশান্তি, বিপ্লবের ইঙ্গিত দিয়ে থাকে।
সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী ফিরে যান স্বর্গলোকের কৈলাসে স্বামীর ঘরে। পরের বছর শরতে আবার তিনি আসবেন এই ধরণীতে যা তার বাবার গৃহ। প্রতিমা বিসর্জনের জন্য সব ধরণের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিদায়ের করুণ ছোঁয়ায় সারিবদ্ধভাবে একে একে বিভিন্ন পুকুর ও দীঘিতে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা।
প্রথা অনুযায়ী প্রতিমা বিসর্জনের পর সেখান থেকে পানি এনে (শান্তিজল) মঙ্গলঘটে নিয়ে তা আবার হৃদয়ে ধারণ করা হয়। আগামী বছর আবার এ শান্তিজল হৃদয় থেকে ঘটে, ঘট থেকে প্রতিমায় রেখে পূজা করা হবে।
সারাদেশে এ বছর ৩১,৪৬১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলেও কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সর্বজনীন ১৯৭ ও ব্যক্তিগত ১৮টিসহ মোট ২১৫টি মন্ডপে এবার শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হয়েছে।
কুলাউড়ায় সব শঙ্কা কাটিয়ে নির্বিঘ্নে শারদীয় উৎসব উদযাপিত হয়েছে। এবার অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সারাদেশের ন্যায় কুলাউড়ার সকল পূজামন্ডপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে কাজ করেছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসারসহ রাজনৈতিক দলসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে উপজেলা প্রশাসনের কয়েকটি টিম বিভিন্ন পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করে নিরাপত্তা নিশ্চিতে তৎপর ছিলেন।
উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন পূজা মন্ডপে হামলা, ভাংচুর করার নির্দেশ দেয়া জনৈক এক প্রবাসীর কথাবার্তা সম্বলিত ওয়াটসআপের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে প্রশাসনের নজরে এলে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা করে কঠোর নজরদারিতে রাখা হয় পূজা মন্ডপগুলো এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনের নির্দেশনায় কয়েকটি মন্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। প্রশাসনের নজরদারিতে এবং কঠোর তৎপরতার কারণে কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শেষ হয় সনাতন ধর্মালম্বীদের সর্ববৃহৎ শারদীয় দুর্গোৎসব দূর্গাপূজা।
এদিকে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশিল্পের জন্য বৃহত্তর সিলেটসহ সারাদেশের হিন্দু ভক্তদের কাছে আকর্ষণীয় কুলাউড়ার কাদিপুর শিববাড়ি মন্দিরে লাখো পূণ্যার্থীর ঢল নামে। পূজার আগে প্রস্তুুতি দেখতে শিববাড়ি মন্দির পরিদর্শন করেছেন জেলা পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদর্শন কুমার রায় ও দীপঙ্কর ঘোষ, ওসি মো. গোলাম আপছার ও সেনাবাহিনীর টহল টিম। পূজা শুরু হওয়ার পর শিববাড়ি মন্দির পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর ডেপুটি ডাইরেক্টর জেনারেল মোঃ জিয়াউল হাসান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্ণেল সাজ্জাদুল আহসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিউদ্দিন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহ জহুরুল হোসেন, সেনাবাহিনীর মেজর আকিব ও ক্যাপ্টেন আদনান সহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তারা। এদিকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শন করেন সাবেক এমপি ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য (কাজী জাফর) নওয়াব আলী আব্বাছ খাঁন, জাতীয়তাবাদী কেন্দ্রীয় আইনজীবী ফোরামের সহ সভাপতি ও মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবেদ রাজা, উপজেলা বিএনপির শওকতুল ইসলাম শকু, জয়নাল আবেদীন বাচ্চু, বদরুজ্জামান সজল, শামীম আহমদ চৌধুরী, আজিজুর রহমান মনির, আব্দুল জলিল জামাল, সুফিয়ান আহমদ, দেলওয়ার হোসেন, জুবের আহমদ খান, আব্দুল মুহিত বাবলুসহ বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
শিববাড়ির বাসিন্দা পূজারী আচার্য্য পুলক সোম বলেন, সবার সহযোগিতায় এবারও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে শিববাড়িতে পূজা উদযাপন করা হয়েছে। এবার লাখো মানুষের সমাঘম ঘটে শিববাড়িতে। নিরাপত্তার জন্য শিববাড়ির বিভিন্ন স্থানে ২০টি সিসি ক্যামেরা বসানো ছিল। শত বছর ধরে তাঁদের বাড়িতে শারদীয় দুর্গোৎসব হচ্ছে। তাঁদের দাদা এই উৎসবের প্রচলন করেন। ভক্তদের সহযোগিতায় মন্দিরের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ হয়েছে।
জানা গেছে, বিজয়া দশমীর নানান আয়োজন ও উপচারে সনাতন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গোৎসবের পাঁচ দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় গত রোববার।
সনাতন ধর্ম মতে- দশভুজা দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গশিখর কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরে গেল। তবে আবারও ভক্তদের কাছে দিয়ে গেলেন আগামী বছর ফিরে আসার অঙ্গীকার। তাই আবারও মর্ত্যলোকে ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় ভক্তরা অশ্রুসিক্ত চোখে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাচ্ছেন। আর এজন্য এক দিকে যেমন বিদায় ও বিচ্ছেদের সুর বাজছে অন্যদিকে আবারও ফিরে আসার আনন্দ কাজ করছে ভক্তকূলের মাঝে। হিন্দু শাস্ত্রমতে, শনিবার (১২ অক্টোবর) পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবে মহানবমীর লগ্ন শেষ হয়। আর এরপর পরই শুরু হয়ে যায় বিজয়া দশমীর লগ্ন। মূলত দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা সেদিন শেষ হলেও বিসর্জন দেওয়া হয় রোববার।
সনাতন শাস্ত্রের বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে, এ বছর দেবী দুর্গা দোলায় (পালকি) চড়ে কৈলাশ থেকে মর্ত্যালোকে (পৃথিবী) এসেছেন। এর ফলে মড়ক, মহামারি ও দুর্যোগ বাড়বে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে আবারও কৈলাশে (স্বর্গে) ফিরে যাচ্ছেন গজে (হাতি) চড়ে। আর এর কারণে শস্যপূর্ণ হয়ে উঠবে এই বসুন্ধরা। হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে বিজয়া দশমীতে কুলাউড়ার বিভিন্ন পুকুর, দীঘি, জলাশয় ও ছোট ছোট খাল-নদীতে দেয়া হয় বিসর্জন ও প্রতীমা নিরঞ্জন। রোববার দুপুর থেকে ট্রাক, পিকআপভ্যানে করে একের পর এক প্রতিমা নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে যান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এই বিদায়যাত্রায় ঢাকের তালে তালে নেচে উঠছেন ভক্তরা।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুলাউড়া উপজেলা শাখার সদস্য সচিব অজয় দাস বলেন, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সর্বজনীন ১৯৭ ও ব্যক্তিগত ১৮টিসহ মোট ২১৫টি মন্ডপে এবার শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হয়েছে। এর মধ্যে শিববাড়িতে ভক্তদের সমাগম হয় সবেচেয়ে বেশি। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীপেশার মানুষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবধরণের সহযোগিতা করার কারণে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপন হয়েছে।
কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: গোলাম আপছার বলেন, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মোট ২১৫ টি মন্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপনে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ছিল। সকলের সহযোগিতায় কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই দুর্গাপূজা সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মহিউদ্দিন বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘœ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে। প্রশাসনের তৎপরতায় কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে পূজা সম্পন্ন হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার বাহিনী, রাজনৈতিক দল, ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ স্বেচ্ছাসেবীরা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছেন।
