মে: মছব্বির আলী: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, এই দেশের মালিক হচ্ছে জনগন। দেশের মানুষ যদি সতর্ক থাকে তাহলে আমাদের আর কোন চিন্তা করতে হবে না। দেশ এগিয়ে যাবে। তাই আজ আমি জনগনের হাতেই এই দেশের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও ভবিষ্যত সঁপে দিয়ে গেলাম। গত এক যুগ মানুষের ভোট ও কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো। ২০২৪ সালে মানুষ বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সেই অধিকার ফিরিয়ে এনেছে। ৫ তারিখ দেশের মানুষ স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। এখন মানুষ শান্তি চায়। কাজ চায়। ভালোভাবে বেঁচে থাকতে চায়। দেশের মানুষ এখন স্থিতিশীলতা চায়, শান্তি চায়, কর্মসংস্থান চায়, চিকিৎসা চায়, শিক্ষার সুযোগ চায়।
তিনি বলেন, দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হলে সবাইকে পরিশ্রম করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি জনগনকেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ জনগনকে নিয়েই বাংলাদেশ। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত অলস হয়ে পড়ে থাকলে দেশ এগিয়ে নেওয়া যাবে না। দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে সকলকে হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে।
বুধবার বিকেলে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমনটি বলেন। প্রধানমন্ত্রী এই অনুষ্ঠান থেকে সারা দেশে একযোগে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচীর তৃতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, দেশে বাক-স্বাধীনতা ফিরে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, আজকে যে কেউ সরকারের বিরুদ্ধেও নির্দিধায় বলতে পারে। সংবাদপত্র সরকারের বিরুদ্ধেও লিখতে পারে। আজকে গণতন্ত্র, বাক ও ব্যক্তির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একারণেই আজকে আমরা জনগনের জন্য কাজ করতে পারছি।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যে ১২ লক্ষ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করেছি। আগামী এক বছরে প্রতিটি উপজেলায় অন্তত ৮ হাজার নারীকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। একবছরের মধ্যে ৪০ লাখ কৃষকদের মধ্যে কৃষক কার্ড প্রদান করা হবে। উপজেলা হাসপাতালে কিডনি ডায়ালেসিসের মেশিন নিয়ে আসা হবে। সব উপজেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। আজকে আমরা একসাথে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, দুস্থদের ঘর নির্মাণের টাকা প্রদান, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বৃত্তি ও অসুস্থদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করেছি। ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমরা একটা দল ছিলাম। কিন্তু আমরা যখন সরকার গঠন করেছি তখন আমরা সব মানুষের সরকার। যারা ভোট দিয়েছে, যারা ভোট দেয়নি সবার সরকার। আমরা সব মানুষের জন্য কাজ রতে চাই। বিএনপি সরকার সব জনগনের কল্যানে কাজ করতে চায়।
বিরোধী দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অতীতে দেখেছি, যখন দেশ এগিয়ে চলে, অর্থনীতি ও শান্তিশৃঙ্খলা স্থিতিশীল থাকে তখনই দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। অতীতে বিএনপির বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে যারা আন্দোলন আন্দোলন খেলা করেছিলো, তারা আজকে আবার বলছে, এই সরকারকে একদিনও সময় দেওয়া যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা বলে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, তারা কি জনগনের স্বার্থে কথা বলছে না নিজেদের স্বার্থে কথা বলছে, তারা নিজেদের স্বার্থে কথা বলছে।
তিনি বলেন, আমাদের শক্তির উৎস জনগন। আমরা জনগনকে নিয়ে রাজনীতি করি। জনগন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি আগামী ৫ বছর দেশ পরিচালনা করবে। অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অতীতে দেশের জনগনের টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এখন থেকে বাংলাদেশের মানুষকে সাথে নিয়ে অর্থ পাচার রোধ করবো। এই দেশের মানুষের অর্থ এই দেশেই থাকবে। কোথাও যাবে না। এই দেরে মানুষের কল্যানে ব্যয় হবে। আমরা জনগনের অর্থ দিয়ে জনগনের জন্য কাজ করতে চাই।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা: এ জে এম এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সংসদ সদস্য এম. নাসের রহমান, মৌলভীবাজা-২ আসনের এমপি আলহাজ্ব শওকতুল ইসলাম শকু, মৌলভীবাজা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু, যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতা মাহিদুর রহমান, জেলা বিএনপির আহবায়ক এডভোকেট ফয়জুল করিম ময়ুন, জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন প্রমুখ। ভিডিওকনফারেন্সে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
এর আগে বুধবার দুপুরে শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। শ্রীমঙ্গলের ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা, এ জেড এম জাহিদ হোসেন। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল আসনের সংসদ সদস্য মো: মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রাণালয়ের অতিরিক্তি সচিব কামাল উদ্দিন বিশ্বাস, জেলা বিএনপির আহবায়ক ফয়জুল করিম ময়ুন এবং ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া নারীদের মধ্যে শিউলী রানী দাস ও ওয়াজেদা বেগম অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
অনুষ্টানে শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫৫টি পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এদিন দুপুর ১টায় শ্রীমঙ্গলে পৌঁছান তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ১০ জন উপকারভোগীর হাতে কার্ড তুলে দেন। এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। উপকারভোগীর পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে এ ভাতা প্রদান করা হবে, ফলে তারা ঘরে বসেই অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম পর্যায়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ১৫৫ জন উপকারভোগীকে এই ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
টানা বৃষ্টির মধ্যেই মৌলভীবাজারে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই তার প্রথম মৌলভীবাজার সফর। সফরকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। এদিকে, বৃষ্টি উপেক্ষা করে শ্রীমঙ্গলে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় জনতার ঢল নামে। শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
বুধবার সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড থেকে মিছিল নিয়ে জনসভাস্থলে আসতে থাকেন দলীয় নেতাকর্মীরা। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলেও ছাতা, রেইনকোট ও পলিথিন মাথায় দিয়ে মাঠে অবস্থান নেন অনেকে। মাঠে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আশপাশের সড়ক ও খোলা স্থানেও মানুষের ভিড় দেখা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার অপেক্ষায় থাকা জনতার মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। জনসভাকে কেন্দ্র করে পুরো শ্রীমঙ্গল শহরে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
বিভিন্ন স্থান থেকে আগত নেতাকর্মীরা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং মৌলভীবাজারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দিকনির্দেশনা ও ঘোষণার প্রত্যাশার কথা জানান।
জনসভাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরাও দায়িত্ব পালন করছেন। বৃষ্টির মধ্যেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি জনসভাকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে। স্থানীয়দের মতে, প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও শ্রীমঙ্গলে এ ধরনের জনসমাগম বিরল, যা প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও উদ্দীপনার বহিঃপ্রকাশ।

