‘বন্য প্রাণীর বন্ধু’ সিতেশ রঞ্জন দেব আর নেই

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার: না ফেরার দেশে চলে গেলেন বন্যপ্রাণীর অকৃত্রিম বন্ধু সিতেশ রঞ্জন দেব। আহত বন্যপ্রাণীর আশ্রয়দাতা, প্রকৃতিপ্রেমী এক সংগ্রামী মানুষের বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একটি নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে উঠত আহত হরিণ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট লজ্জাবতী বানর, উদ্ধার হওয়া অজগর, চশমা পরা হনুমান কিংবা অসহায় পাখিদের ছবি। সেই মানুষটি আর নেই। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট পশু-পাখিপ্রেমী এবং প্রকৃতিপ্রেমী সিতেশ রঞ্জন দেব মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫ মিনিটে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় শ্রীমঙ্গল রামকৃষ্ণ মিশনরোডস্থ তার বাসভবনে। সেখানে ভীড় জমে শত শত মানুষের। পরে তার মরদেহ নেয়া হয় তার বিচরণক্ষেত্র বাংলাদেশ বণ্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে বর্তমানে অবস্থানরত আহত প্রাণীদের সামনে। সেথানে তাকে একনজর দেখতে ছুটে যান শত শত মানুষ। সেখান থেকে বিকাল ৩টায় শ্রীমঙ্গল নোওয়াগাস্থ তার পৈত্রিক বাড়িতে তার সবদেহ নেয়া হলে সেখানে শত শত মানুষ তাকে শেষ বারের মতো শ্রদ্ধা জানান। পরে সেখানেই তাঁর পারিবারিক শশাণঘাটে শুরু হয় তার দাহকারয। শুধু একজন মানুষ নন, তিনি ছিলেন হাজারো আহত ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর শেষ আশ্রয়স্থল। বাজারে গিয়ে নিজের পরিবারের আগে পশু-পাখির খাবার কিনতেন—এমনই ছিল তাঁর প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা। নিজের প্রয়োজনকে তুচ্ছ করে জীবনের পুরোটা সময় ব্যয় করেছেন নির্বাক প্রাণীদের সেবায়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন ধরে তিনি শ্রীমঙ্গলের রামকৃষ্ণ মিশন রোডস্থ নিজ বাসভবনে অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে শ্রীমঙ্গল পলি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যুকালে তিনি তিন ছেলে, চার পুত্রবধূ, চার কন্যা, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: জিয়াউর রহমান তাঁর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেসক্লাব, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব, শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরিবেশবাদী সংগঠন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা পৃথক শোকবার্তায় বলেন, তাঁর মৃত্যু দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

ভাল্লুকের থাবায় বদলে যাওয়া জীবন: ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে পাত্রখলা চা বাগানে বন্য শুকর তাড়াতে গিয়ে বিশাল এক ভারতীয় ভাল্লুকের আক্রমণের শিকার হন তিনি। ভাল্লুকের থাবায় একটি চোখ, নাক, গালের বড় অংশ, মুখের একাংশ এবং দাঁত হারান। মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে একাধিক প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে তিনি নতুন জীবন ফিরে পান।

নিজেই বলতেন—”এটি আমার দ্বিতীয় জীবন।” সেই দ্বিতীয় জীবন তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বন্যপ্রাণীর সেবায়।

তিনি হাজারো প্রাণীর জীবনদাতা: গত চার দশকে তিনি হাজার হাজার বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছেন। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট লজ্জাবতী বানর, অজগর, মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, চশমা পরা হনুমান, বন্য শুকর, ঈগল, তক্ষক, বিভিন্ন প্রজাতির সাপসহ অসংখ্য প্রাণী তাঁর সেবায় নতুন জীবন পেয়েছে। শ্রীমঙ্গলে তাঁর বাড়ি একসময় মানুষের কাছে “মিনি চিড়িয়াখানা” নামে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু সেটি ছিল প্রকৃতপক্ষে আহত ও অসহায় বন্যপ্রাণীর একটি আশ্রয়কেন্দ্র।

অর্থকষ্টের মধ্যেও থামেননি: প্রাণীদের খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যয় মেটাতে তাঁকে নিজের মাছের খামারের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো। অনেক সময় অর্থসংকটে পড়েও তিনি প্রাণীদের সেবা বন্ধ করেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের পরামর্শে ২০১১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এরপর তাঁর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। অসংখ্য প্রাণী চিকিৎসা শেষে লাউয়াছড়া বনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়।

বৃক্ষপ্রেমীও ছিলেন তিনি: বন্যপ্রাণীর খাদ্য নিশ্চিত করতে তিনি রাস্তার পাশে, পাহাড়ি ছড়ার ধারে এবং বিভিন্ন বনাঞ্চলে হাজার হাজার ফলজ ও বনজ বৃক্ষ রোপণ করেন। পাহাড়ি ছড়ায় কাঁকড়া, হিল ফিশ, শামুকসহ নানা প্রাণীর খাদ্যও অবমুক্ত করতেন, যাতে বনজ বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকে।

এক অপূরণীয় শূন্যতা: সিতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, শোকাহত সমগ্র প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীপ্রেমী সমাজ। যে মানুষটি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সারাজীবন নির্বাক প্রাণীদের জন্য লড়েছেন, তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে সিতেশ রঞ্জন দেব একটি অনন্য নাম হয়ে থাকবেন। যতদিন আহত কোনো প্রাণী মানুষের সহানুভূতির অপেক্ষায় থাকবে, ততদিন ভালোবাসা, সাহস আর মানবিকতার প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবেন এই নিরহংকার মানুষটি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *