কুলাউড়ায় একাধিক মামলায় জর্জরিত ইছলাছড়া পুঞ্জির খাসিয়ারা, প্রতিবাদে মানববন্ধন

কুলাউড়া প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে ইছলাছড়া খাসিয়া পুঞ্জির লোকদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে বনবিভাগের বিরুদ্ধে। গত কয়েক বছরে খাসিয়াদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ কর্তৃক অন্তত ১৫-২০টি মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ খাসিয়াদের। এমনকি সম্প্রতি বরমচাল ইউনিয়নের কালিয়ারগর এলাকায় গাছ কাটার অভিযোগ এনে খাসিয়াদের মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেন তারা।
এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের মদদে ইছলাছড়া পুঞ্জির নিরীহ লোকদের ওপর গাছ কাটার অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে ১ আগস্ট মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করে পুঞ্জির লোকজন। এসময় তারা সরকারসহ প্রশাসনের কাছে প্রতিকার চান এবং ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
জানা যায়, উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে ইছলাছড়া পান পুঞ্জিতে প্রায় শতাধিক খাসিয়া পরিবারের বসবাস। প্রাচীন কাল থেকে এ পুঞ্জিতে খাসিয়ারা বসবাস করছে। জীবিকা হিসেবে তারা পান, সুপারিসহ বিভিন্ন ফসলাদি চাষ করে তাদের পরিবার চালাচ্ছে। কিন্তু খাসিয়াদের পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পাশাপাশি নাজেহাল করেছে বনবিভাগ। বিশেষ করে বন বিভাগের কুলাউড়া রেঞ্জ অফিস, বরমচাল বিট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২০২২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বনবিভাগের হয়রানিমূলক মামলা থেকে রেহাই পায়নি পুঞ্জির বয়স্ক পুরুষ ও নারীরা।
পুঞ্জির লোকজন অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান হেডম্যান (মন্ত্রী) লিডিয়া সিল্লা (৭০) এর বিরুদ্ধে ৩টি, ছেলে ফ্লো হ্যাবেন জনি সিল্লার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা, লাকি স্টারের বিরুদ্ধে ২টি মামলা, আলফায়েস সিল্লার বিরুদ্ধে ৩ টি মামলা, ব্রিনাল খাসিয়ার বিরুদ্ধে ২ টি, হরলাল সিল্লার বিরুদ্ধে ৩ টি, স্ট্রীম লিড খাসিয়ার বিরুদ্ধে ২টি মামলা ও মন্নান খংলার বিরুদ্ধে ৩ টি, হ্যাভেন বি ল্যামিনের বিরুদ্ধে ৩ মামলাসহ ইছলাছড়া পুঞ্জির খাসিয়াদের বিরুদ্ধে বনবিভাগ প্রায় ১৫-২০টি মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।
ইছলাছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা ফ্লো হ্যাভেন জনি সিল্লা অভিযোগ করে বলেন, বনবিভাগের লোকজনের যোগসাজশে একটি কুচক্রী মহল নিয়মিত গাছ চুরি করে। পরে সেই গাছ চুরি বা কাটার দায়ে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। সম্প্রতি আমাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও বনবিভাগ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কুলাউড়া থানায় আমাদের বিরুদ্ধে ফের মিথ্যা মামলা দিয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে আমরা আমাদের পুঞ্জিতে সুপারি ও পান গাছের চারা রোপন করে থাকি। বনবিভাগের বরমচাল বিটের ফরেষ্ট গার্ড প্রতিনিয়ত এসে টাকা দাবী করে। বিভিন্ন হুমকি ধামকি দিয়ে ৪-৫ হাজার টাকা চাঁদা নিয়ে থাকে। বিশেষ করে শুকনো জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গেলে ফরেষ্ট গার্ডকে চাঁদার টাকা দিতে হয়। তিনি বলেন, বনবিভাগ প্রভাবশালীদের কাছে বনভূমির মূল্যবান কাঠ বিক্রি করেছে। খাসিয়ারা কখনো গাছ কাটে না। গাছ রক্ষা করে গাছের নীচে পান রোপন করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে।
ইছলাছড়া পুঞ্জির হেডম্যান লিডিয়া সিল্লা জানান, আমাদের পূর্ব পুরুষের সময়কাল থেকে এই পুঞ্জিতে আমরা বসবাস করে আসছি। বনবিভাগের একেরপর এক মিথ্যা মামলার কারণে আমরা অতিষ্ঠ। আমাদের পুঞ্জিতে সেগুন গাছের কোন অস্বিত্ব নেই। এরপরও সেগুন গাছ চুরি, বনভূমি জবরদখলসহ নানা অজুহাতে ২০২২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত আমাদের পুঞ্জির বিভিন্ন লোকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দিয়েছে বন বিভাগ। মামলাগুলো মোকাবেলা করতে গিয়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্থের পাশাপাশি হিমশিম খাচ্ছি। আমরা সরকারসহ প্রশাসনের কাছে এসব ঘটনার প্রতিকার চাই।
এ ব্যাপারে কুলাউড়া বনবিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার রবীন্দ্র কুমার সিংহ বলেন, ইছলাছড়া পুঞ্জি ভাটেরা হিল রিজার্ভ ফরেস্টের অন্তর্গত। এখানে মোট ১ হাজার ১৯৭ একর জায়গা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫০ একর বনভূমি নিয়ে পুঞ্জির সাথে আদালতে মামলা চলমান আছে। গত ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জেলা জজ আদালত উক্ত বনায়নের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে খাসিয়ারা ওই বনভূমি দখলের বিভিন্ন কর্মকা-ে লিপ্ত রয়েছে। আমরা এক ইঞ্চি বনভূমিও দখল করতে দেব না।” আর খাসিয়াদের আনীত অভিযোগ সঠিক নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *