বেতাগী (বরগুনা) প্রতিবেদক : বরগুনার বেতাগীতে সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার অপরাধ ও ব্লাকমেইলিং ভয়াবহ রুপ নিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার রিমুভ করার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে। একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্র ফেসবুক, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই অপকর্ম চালাচ্ছে। ছবি-ভিডিও ভাইরাল করার ভয় দেখিয়ে চক্রটি ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের অভিযোগ ” বেশ কিছুদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে সক্রিয় রয়েছে। চক্রটির বিভিন্ন উপায়ে বা এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের সাধারণ ছবি সংগ্রহ করছে। পরবর্তীতে তা বিকৃত (মর্ফ) করে বা গোপন মুহূর্তের ছবি-ভিডিওর কথা বলে ভুয়া ও আপত্তিকর কন্টেন্ট তৈরি করছে।
এরপর বুয়া আইডি দিয়ে ভুক্তভোগীদের ইনবক্সে যোগাযোগ করে সেগুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তারা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে। এমনকি একবার টাকা দিলেও পরে আরো বেশি অঙ্ক দাবি করছে।
মান-সম্মানের ভয়ে এবং লোকলজ্জার কারণে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী চক্রটিকে হাজার হাজার টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষার্থীর অভিযোগ,‘ফেসবুকের কিছু ভুঁইফোড় পেজ থেকে তাদের টার্গেট করা হচ্ছে। টাকা না দিলে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে হুমকি ও টাকা না দেওয়ায় প্রায়শই ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে অনেকেই এখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতেও ভয় পাচ্ছে।
বেতাগী সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তিশা বলেন, ‘আমরা ভাই-বোন কোথাও ঘুরতে গেলে অনেক সময় গোপনে আমাদের ছবি ও হাটার ভিডিও ধারণ করে সেগুলো বিভিন্ন অ্যাপ ও পেজে পোস্ট করা হচ্ছে। এভাবে যদি আমাদের ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করা হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?’
শুধু তিশা নয়, একই প্রতিষ্ঠানের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো: নবীন বলেন,‘ এখানকার বেশ কিছু পেজে মানুষের অজান্তে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ পাওয়ার পাশাপাশি অনেকেই হয়রানি ও বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি দ্রুত বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’বেতাগী সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোসা: লামিয়া মুনতাহা বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? রাস্তাঘাটে বা বিভিন্ন জায়গায় বসে থাকা অবস্থায় গোপনে ছবি তুলে তা পোস্ট করা হচ্ছে। বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক। এতে আমরা প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তকর পরিস্থিতির মধ্যে পরছি এবং হয়রানির শিকার ও বিব্রত হচ্ছি।’
দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিজা বলেন, ‘সত্যি বলতে এসব বিষয় দেখতে খুব খারাপ লাগে। আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো এখানে পোস্ট করা হচ্ছে। বেশি টার্গেট করা হচ্ছে মেয়েদের, আনরা এবিষয়টা নিয়ে খুবই আতঙ্কিত।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, কারো অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ধারণ বা ইন্টারনেটে ছড়ানো সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে অত্যন্ত গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ধরনের পরিস্থিতিতে চুপ না থেকে তারা দ্রুত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে বেতাগী থানার অফিসার ইনচার্জ মো. হারুন অর রশীদ হাওলাদার বলেন, ‘কিছু পেজের নাম আমরা একাধিকবার মৌখিকভাবে পেয়েছি। অভিযোগ রয়েছে, এসব পেজে থেকে ছেলে-মেয়েদের ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে। বিষয়গুলো আমাদের নজরে রয়েছে এবং এসব সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে।”
তিনি আরও জানান, ‘কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করে হয়রানি বা সম্মানহানি করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। “
এ নিয়ে স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষাথীদের মাঝে সাইবার সচেতনতা বাড়াতে হবে। তারা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় শিক্ষার্থীর নাম, ছবি, ফোন নম্বর বা পাসওয়ার্ড কখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরিচিত কারো সাথে শেয়ার না করা। যদি কেউ অনলাইনে হ্যারাস বা ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে, তবে ভয় না পেয়ে সাথে সাথে মা-বাবা, শিক্ষক অথবা প্রশাসনকে জানানো। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খুব দ্রুত ‘সাইবার সিকিউরিটি সেল’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
এবিষয় বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহা: সাদ্দাম হোসেন বলেন, বিভিন্ন জনের কাছ থেকে আমিও একাধিক অভিযোগ শোনার পর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে প্রকৃত সাইবার অপরাধীকে শনাক্ত ও দমনে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়ছে। এ উপজেলায় কেউ সাইবার অপরাধের শিকার হলে ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা দিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনগত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল সাইবার অপরাধী ও চাঁদাবাজ চক্রটিকে দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

