বিশেষ প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের মিশন চৌমুহনী এলাকায় বায়তুল আমান জামে মসজিদের নামে ক্রয়কৃত ভূমি ও স্থানীয় রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা ফাতু মিয়ার মালিকানাধীন জমি নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে বিরোধ চলছে। এই বিরোধ নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে উপজেলা পরিষদের গত মাসিক আইন শৃঙ্খলা সভায়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বিরোধকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বিরোধপূর্ণ জমির একাংশের মালিক ফাতু মিয়াকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে দশ হাজার টাকা জরিমানা ও তার ছেলে আব্দুল মুকিতকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রনয় বিশ্বাস। এমনকি ফাতু মিয়ার অপ্রাপ্ত বয়স্ক নাতি কাওসার আহমদ কাইছকে তার দোকান থেকে আটক করে নিয়ে যান সহকারী কমিশনার (ভূমি)। পরে আবার উর্দ্ধতন এক কর্মকর্তার নির্দেশে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
পরবর্তীতে ফাতু মিয়া বাদী হয়ে গত ৪ অক্টোবর মৌলভীবাজার সিভিল জজ আদালতে মসজিদ কমিটির সভাপতি-সম্পাদক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সহ ৬ জনকে মূল বিবাদী ও জেলা প্রশাসককে মোকাবিলা বিবাদী করে মোকদ্দমা নং-২৩০/২০২৬ ইং (স্বত্ব) দায়ের করেন।
মামলায় বিবাদী করা হয়, ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের জালালাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আহমদ উল্ল্যার ছেলে বায়তুল আমান জামে মসজিদের বর্তমান সভাপতি আওলাদ হোসেন ফখরু, ছয়ফুল আলম, এলখাছ মিয়ার ছেলে মসজিদ কমিটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ, শফিকুর রহমান, কুলাউড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও মৌলভীবাজারের সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী। মোকাবিলা বিবাদী করা হয় জেলা প্রশাসককে। পরবর্তীতে গত ৬ অক্টোবর সিনিয়র সিভিল জজ আদালত ১-৭ নং বিবাদীগণের নামে সমন জারি করেন এবং আগামী ২০২৭ সালের ২৭ জানুয়ারির মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। এদিকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর মসজিদের জায়গা নিয়ে বিরোধের জেরে সরকারি রাস্তার জায়গা অবৈধভাবে দখল করে বাউন্ডারি নির্মাণের অভিযোগে ফাতু মিয়াকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও ৫ অক্টোবর তার ছেলে আব্দুল মুকিতকে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রনয় বিশ্বাস।
মামলার বাদী মো. ফাতু মিয়া জানান, জালালাবাদ মৌজার মিশন চৌমুহনীতে আমার মালিকানাধীন আনোয়ারা মার্কেট ও বসতবাড়ির পশ্চিম পাশে বায়তুল আমান জামে মসজিদ অবস্থিত। কয়েক মাস আগে মসজিদের সীমানা নির্ধারণ করতে সার্ভেয়ার দিয়ে জরিপ করা হয়। জরিপকালে সার্ভেয়ার ভূলবশত বায়তুল আমান জামে মসজিদের দাগ ৮০১৬ এর পূর্বে আমার মালিকানাধীন ৮০১৭ নং দাগের পশ্চিম সীমানার ভিতরে প্রায় ২৮ ফুট অতিরিক্ত ঢুকিয়ে সীমানা পিলার বসিয়ে দেয়া হয়। তখন আমি আপত্তি জানালে জরিপকারীসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা আমার কথায় কর্নপাত না করে একপ্রেশি সিদ্ধান্ত দিয়ে চলে যান। পরবর্তীতে গত ৯ মে ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. রফিক আহমদ ও ওয়ার্ড সদস্য আপ্তাব মিয়ার উপস্থিতিতে দুইজন সার্ভেয়ার দিয়ে জরিপ করালে দেখা যায়, পূর্বের সার্ভেয়ার কর্তৃক জরিপকালে মসজিদের পূর্বের সীমা আমার মালিকানাধীন ভূমির পশ্চিম পাশে ২৮ ফুট অতিরিক্ত ঢুকানোর কারণে আমার দুই থেকে আড়াই শতক ভূমি মসজিদের সীমানার ভেতর চলে গেছে। আমার মালিকানাধীন ভূমি ও মসজিদের ভূমির সঠিক সীমানা নির্ধারণ করার জন্য গত ৪ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে একটি আবেদন দিয়েছি। কিন্তু আজও কোন প্রতিকার পাইনি বরং আমাকে উল্টো জরিমানা ও আমার ছেলেকে ১৫ দিনের জেল দেয়া হয়েছে। এমনকি বিবাদী পক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে আমার অপ্রাপ্ত বয়স্ক নাতি কাওসার আহমদ কাইছকে আমার মালিকানাধীন দোকান থেকে আটক করে নিয়ে যান সহকারী কমিশনার (ভূমি)। পরবর্তীতে আটকের কয়েক ঘন্টা পর প্রশাসনের উর্দ্ধতন এক কর্মকর্তা সহকারী কমিশনারকে ফোন দিলে আমার ছেলেকে ছেড়ে দেয়া হয়। আমি প্রশাসনের কাছে ন্যায় বিচার কামনা করছি।
আদালতে দায়েরকৃত মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের জালালাবাদ মৌজায় আরএস ৮০১৫ দাগে ৮ শতক ও ৮০১৭ দাগে ২২ শতকসহ মোট ৩০ শতক ভূমির মালিক হন রাজাপুর মিশন চৌমুহনী এলাকার বাসিন্দা মৃত চেরাগ মিয়ার ছেলে মো. ফাতু মিয়া ও মো. ফারুক মিয়া। এদিকে বিবাদীপক্ষের ৮০১৬ নং পৃথক আরএস খতিয়ানের ১০৯১ নং খতিয়ানের ৬ শতক ভূমি বায়তুল আমান জামে মসজিদের নামে রেকর্ড হয়। পূর্ববতী এস. এ ৫০০৭ নং দাগের একটি অংশ হতে ফাতু মিয়া মসজিদ বরাবরে ১ শতক ভূমি দান করেন এবং ৫ শতক ৫০ শতাংশ ভূমি রেজিস্ট্রি দলিল মূলে বিক্রয় করেন। ৬ শতক ৫০ শতাংশ ভূমি ফাতু মিয়ার তপশীলভুক্ত ৩০ শতক ভূমির দখলীয় ভূমির অংশ নয়। মসজিদে দান করা ১ শতক ভূমি ও বিক্রয় করা অংশ পৃথক স্থানে অবস্থিত এবং বর্তমানে ফাতু মিয়ার ৩০ শতক ভূমির উপর মূল বিবাদীগণ দাবী ও হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ ফাতু মিয়ার। ওই ভূমির বিরোধ সুষ্ঠু নিষ্পত্তি ও ভূমির সঠিক সীমানা নির্ধারণের জন্য ফাতু মিয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবরে যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭, ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর গণশুনানীর জন্য নোটিশ প্রদান করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। পরবর্তীতে ১ অক্টোবর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিনে ভূমি পরিদর্শন ও তদন্ত করেন। ওইসময় ফাতু মিয়া তার ভূমির মালিকানার যাবতীয় কাগজপত্র সহকারী কমিশনার ভূমির কাছে উপস্থাপন করেন। কিন্তু ওইসময় ফাতু মিয়ার উপস্থাপনকৃত কাগজপত্র এবং রেকর্ড আমলে নেয়া হয়নি বলে দাবি ফাতু মিয়ার। তিনি বলেন, ওইসময় ১-৪ নং বিবাদীগণের বক্তব্যকে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) ৩ দিনের মধ্যে সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে দেয়ার মৌখিক নির্দেশনা দেন। এই নির্দেশের কারণে ফাতু মিয়ার ভূমি ও মসজিদের ভূমি নিয়ে বিরোধ আরো প্রকট আকার ধারণ করে। পরে ৭ অক্টোবর মামলার বাদী ফাতু মিয়া বিরোধপূর্ণ ভূমিতে অন্তবর্তীকালীন অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদন করলে সিভিল জজ আদালত মামলার বিবাদী আওলাদ হোসেন ফখরু, ছয়ফুল আলম, আব্দুল লতিফ ও শফিকুর রহমানকে বিরোধপূর্ণ ভূমিতে কোন প্রকার কাজ না করা ও হস্তক্ষেপ না করার জন্য আগামী ২৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করেন।
এ বিষয়ে বায়তুল আমান জামে মসজিদের বর্তমান সভাপতি আওলাদ হোসেন ফখরু মুঠোফোনে বলেন, ফাতু মিয়া অতীতে মসজিদের দায়িত্বে থেকে সড়ক ও জনপদের জায়গায় মসজিদ নির্মান করেন। ১৯৯৯ সালে এস.এ রেকর্ড অনুযায়ী ফাতু মিয়ার কাছ থেকে মসজিদের নামে সাড়ে ছয় শতক ভূমি ক্রয় করা হয়। বর্তমানে আমাদের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনে অভিযোগ দিলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) গণশুনানীর নোটিশ দিয়ে আমরা উভয়পক্ষ যাবতীয় কাগজপত্র এসিল্যান্ড স্যারকে দেখাই। তখন উভয়পক্ষ সিদ্ধান্ত মেনে নেয় এবং তিন দিনের মধ্যে সীমানার প্রাচীর তৈরি করার জন্য বলা হয়। কিন্তু ফাতু মিয়া সেটি না করে উল্টো আদালতে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রনয় বিশ্বাস জানান, সরকারি জায়গা ও মসজিদের খরিদকৃত জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ছিল। অভিযোগের ভিত্তিতে উভয়পক্ষকে নিয়ে শুনানী করে সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হয় এবং মসজিদের সীমানা প্রাচীর তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। কিন্তু সরকারি নির্দেশনা অমান্য করায় ফাতু মিয়াকে জরিমানা ও তার ছেলেকে ১৫ দিনের জেল দেয়া হয়েছে। এখন যেহেতু বিষয়টি নিয়ে আদালতে ফাতু মিয়া মামলা করেছেন সেহেতু বিষয়টি এখন উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তমতে পরবর্তী কার্যক্রম চলমান থাকবে।

