জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার:
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় মৌলানা মুফজ্জল হোসেন মহিলা ডিগ্রি কলেজে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি করে উপাধ্যক্ষ পদে ওই কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদকে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২৫ জুলাই সোমবার কলেজে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। নিয়োগ পরীক্ষায় ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ দেবাশীষ দেবনাথ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও এলাকায় অবস্থিত মৌলানা মুফজ্জল হোসেন মহিলা ডিগ্রি কলেজ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি এই কলেজের গভর্ণিং বডির সভাপতি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলেজে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সম্প্রতি কলেজের অন্য সিনিয়র শিক্ষকদের না জানিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ জুনিয়র শিক্ষক তোফায়েল আহমদকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেন। তিনি প্রায় দুই মাস ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পরীক্ষায় মোট পাঁচজন প্রার্থী ব্যাংক ড্রাফট্ এর মাধ্যমে তাদের আবেদনপত্র জমা দেন। এরমধ্যে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ তাকেসহ অন্য ৪ প্রার্থীকে নিয়োগ পরীক্ষার চিঠি প্রদান করেন। এটা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। যা আইন ও বিধি সম্মত নয় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা।
নিয়োগ পরীক্ষায় কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ, রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফজলুল বারী মজুমদার, গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহেষ চন্দ্র দেবনাথ, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফরিদ হোসেন, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিলকিস বেগম প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু ওই পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে তোফায়েল আহমদ শিক্ষকদের চাকুরীর বয়স অনুযায়ী সবার চেয়ে জুনিয়র ছিলেন। যার কারণে একই কলেজের সিনিয়র ৪ জন শিক্ষক ওই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেননি। কৌশলতা অবলম্বন করে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই ৪ শিক্ষককে বাদ রেখে নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষার দিন দুজন শিক্ষককে প্রার্থী দেখিয়ে নিয়োগ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে একই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদা আক্তার ও রাজনগর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক রজত কান্তি গোস্বামীকে নতুন প্রার্থী দেখানো হয়। অথচ রজত কান্তি গোস্বামী রাজনগর সরকারি কলেজ থেকে আগামী ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে অবসর নেয়ার কথা।
কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহেষ চন্দ্র দেবনাথ মুঠোফোনে বলেন, নিয়োগ পরীক্ষা নিয়মতান্ত্রিক ও সুষ্ঠুভাবে হবেনা জেনে আমরা পরীক্ষায় অংশ নেইনি। যেকোন প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে একটা নিয়মের মধ্যে দিয়ে। সেই নিয়মকে পাশ কাটিয়ে কলেজে সিনিয়র শিক্ষকদের বাদ দিয়ে জুনিয়র একজন শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। উপাধ্যক্ষ পদে আমরা ৫জন প্রার্থী ছিলাম। তারমধ্যে জুনিয়র শিক্ষক তোফায়েল আহমদকে অনিয়ম করে উপাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরো দুইজন শিক্ষক বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার পূর্বে কলেজের জুনিয়র এক শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে। তারপরও উপাধ্যক্ষ পদে শিক্ষকরা আবেদন করলেও নিয়োগ পরীক্ষা নিয়মতান্ত্রিকভাবে হবে না বলে আমরা পরীক্ষায় অংশ নেইনি।
রাজনগর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক রজত কান্তি গোস্বামী মুঠোফোনে বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে আমি নিয়োগ পরীক্ষার চিঠিটি হাতে পাই। আগামী বছরের আগস্ট মাসে চাকুরী থেকে আমার অবসর নেয়ার কথা। চাকুরীর শেষ সময়ে কেন উপাধ্যক্ষ পদে আবেদন করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চাকুরীর শেষ বয়সে অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য ওই কলেজে উপাধ্যক্ষ পদে আবেদন করেছিলাম। তিনি দেড় মাস আগে চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও উক্ত চিঠিটি অন্য শিক্ষকরা হাতে পান গত ১৮ জুলাই।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ মুঠোফোনে বলেন, নিয়োগ পরীক্ষায় মোট আটজন প্রার্থী ছিলেন। তারমধ্যে ৪ জন কেন আসেননি সেটা জানিনা, সেটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। নিয়োগ বোর্ডে পরীক্ষার মাধ্যমে আমি উপাধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। আপনিসহ অন্য ৪ জন শিক্ষককে কিভাবে নিয়োগের চিঠি ইস্যুৎ করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা তো কলেজ গভর্ণিং বডির সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের অনুমতি নিয়ে এই চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। নতুন করে দু’জন শিক্ষককে প্রার্থী দেখানো হয়নি তারা পাশাপাশি সময়ে আবেদন করেছিলেন। নিয়োগ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি যতটুকু মনে করি, নিয়োগ প্রক্রিয়া সঠিকভাবে হয়েছে।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও নিয়োগ পরীক্ষায় ডিজির প্রতিনিধি দেবাশীষ দেবনাথ মুঠোফোনে বলেন, নিয়োগ পরীক্ষায় তিনজন প্রার্থী ছিলেন। আমরা তাদের আবেদনপত্র দেখে পরীক্ষা নিয়ে ফলাফল প্রকাশ করি। নিয়োগের বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন কলেজ গভর্ণিং বডির সভাপতি।
কলেজের গভর্ণিং বডির সভাপতি ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের ব্যবহৃত মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগ করলে মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

