জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার:
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের হুগলিছড়া চা বাগানে দাঁড়িয়ে আছে তিন শত বছরের এক পুরোনো বটগাছ।
আমাদের দেশে অতি চেনা একটি বৃক্ষ হলো বটবৃক্ষ। আকার ও আকৃতির জন্য এ বৃক্ষটিকে সহজেই চেনা যায়। গ্রামীণ ঐতিহ্য বটবৃক্ষ নিয়ে সমাজে রয়েছে নানা কুসংস্কার। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন বটগাছে ভুত থাকে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বটবৃক্ষকে দেবতা হিসাবে পুজা করতো। বটবৃক্ষের সাথে বিয়ের ঘটনা হিন্দু সমাজে প্রচলিত ছিল। গ্রাম বাংলার আদিমতম বৃক্ষ হিসাবে যুগ যুগান্তর ধরে টিকে আছে বটবৃক্ষ।
বট গাছের ইংরেজী নাম Indian bauan বৈজ্ঞানিক নাম Ficus benghalensis. এটিফাইকাস বা ডুমুর জাতীয় গোত্রের ইউরোস্টিগ্মা উপগোত্রের সদস্য। এর আদি নিবাস হল বঙ্গভূমি।
কালের সাক্ষী হিসেবে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের হুগলিছড়া চা বাগানের ১১ নম্বর বস্তির লাইনে তিন শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বটবৃক্ষটিকে শুধু সাধারণ একটি বটবৃক্ষ ভাবলে ভুল হবে। এটি হলো তিন শত বছরের এক অনন্য স্মৃতি। পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে বটবৃক্ষটির শাখা প্রশাখা। বৃক্ষটির শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে লাইনের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। আজও বটবৃক্ষটি রয়েছে সবুজ-সতেজ।
প্রাচীন এ বটবৃক্ষটির ডালপালা যেমন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তেমনি এটির কল্পগাথাও যুগের পর যুগ ধরে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জেলায়। মনোমুগ্ধকর এ বটবৃক্ষটির নিচে প্রতিষ্ঠা হয়েছে হরি মন্দির, নিয়মিত হচ্ছে গ্রাম পূজা। এটি দেখতে মৌলভীবাজারসহ আশপাশ জেলার অনেক দর্শনার্থী ভিড় করেন প্রত্যন্ত হুগলিছড়া চা বাগানে।
হুলিয়া ছড়া চা বাগানের ১১ নম্বর বস্তির বাসিন্দা খোকা তাঁতী বলেন, ‘আমার মৃত দাদা নলু তাঁতী ছোটবেলা থেকেই এ বটগাছটি এভাবেই দেখে এসেছেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় এ গাছটি সম্পর্কে আমাদের কাছে অনেক গল্প করেছেন। আমাদের ১১ নম্বর বস্তিতে ১১২ ঘর শ্রমিক রয়েছেন। তারা এখানে পূজা করেন। এ গাছটি আমাদের জন্য দেবতুল্য।’
একই এলাকার বাসিন্দা বিমল চাষা বলেন, ‘আমার বয়স অর্ধ শতাব্দি পেরিয়েছে অনেক আগেই। আমি আমার বাবা-দাদার কাছে এ গাছটি সম্পর্কে জেনেছি। আমিও ছোটবেলা থেকেই গাছটিকে এ অবস্থায় দেখে আসছি। আমার মৃত দাদা আমাদের কাছে গল্প করেছেন তিনি তার দাদার কাছে শুনেছেন হুগলিছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই এখানে বট গাছটি ছিল, এখনো আছে। আমাদের লাইনের মানুষজন এখানে নিয়মিত গ্রাম পূজা করেন। অনেকে আবার মনের আশা পূরণের জন্যও গাছটিতে লাল সুতা ঝুলিয়ে দেন। কেউ কেউ এটির নিচে মোমবাতি জ্বালান।’
৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইয়াছিন আরাফাত রবিন বলেন, ‘হুগলিছড়া চা বাগানের ১১ নম্বর বস্তির সড়কের পাশে বটগাছটির বয়স আনুমানিক তিন শতাধিক বছর। আমার বাবা-দাদারাও এ গাছটি অনুরূপ দেখে এসেছেন। দীর্ঘদিন ধরে এ গাছটি সড়কে চলাচলকারী পথিকের বিশ্রামে ব্যবহৃত হয়। প্রতিদিন বিকেলে এ গাছটির ডালে ডালে পাখিদের কিচির মিচির তনোমন ভরিয়ে দেয়। আমাদের দেশ থেকে দিন দিন বট গাছ বিলুপ্তির পথে। আমি তিন শতাধিক বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এ বট গাছটি রক্ষণাবেক্ষণের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছি।’

