কুলাউড়ায় কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কে বড় ভাঙ্গন

মাহফুজ শাকিল:‘মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় মনু নদীর ওপর ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘রাজাপুর সেতুনির্মাণের কাজ প্রায় পাঁচ বছর আগে শেষ হয়েছে। কিন্তু সেতুর দুই পাশের সাড়ে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়কের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার দীর্ঘ সময় ধরে নির্মিত সেতুটি অবহেলায় পড়ে আছে। সেতু দিয়ে বড় যানবাহন না চললেও স্থানীয় লোকজন চলাচল করছেন। এদিকে কচ্ছপ গতিতে সংযোগ সড়কের কাজ চললেও কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্য শেষ করা নিয়ে বেশ শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংযোগ সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করে সেতু চালু করার দাবি স্থানীয় এলাকাবাসীর। এদিকে সড়কের কাজে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না রাখায় এবং সঠিকভাবে কাজ না করায় সামান্য বৃষ্টি দিলেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে বড় বড় ভাঙ্গন। সরেজমিনে বুধবার বিকেলে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের গজভাগ আহমদ আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ সংলগ্ন এলাকায়  গিয়ে  দেখা যায়, সংযোগ সড়কে প্রায় ৮-১০টি স্থানে ছোট বড় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে ২টি স্থানে প্রায় ১৫-২০ ফুট জায়গা জুড়ে বড় বড় ভাঙ্গন দেখা দেয়। ওই স্থানে সড়কে ভরাট করা বালু ও ইটের খোয়া সরে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় চলাচল নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় লোকজন। যেকোন সময় দুর্ঘটনারও আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয় লোকদের অভিযোগ, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতি ও অবহেলার কারণে বৃহৎ এই প্রকল্পের কাজে নয়ছয় হচ্ছে। সঠিকভাবে কাজ করলে সড়কে এত ভাঙ্গন দেখা দিতনা। এ প্রকল্পের মেয়াদে কাজ প্রায় পাঁচ বছরে এখন পর্যন্ত হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। প্রায় এক শত কোটি টাকা প্রকল্পের সংযোগ সড়কের কাজ কবে শেষ হবে, কবে চালু করা হবে স্বপ্নের রাজাপুর সেতু জানেন না এতদ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ। ধীরগতিতে কাজ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সওজ অধিদপ্তর ও স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়ার দক্ষিণাঞ্চলে পৃথিমপাশা, হাজীপুর ও শরীফপুর ইউনিয়নের মানুষ লাগাতার কয়েক বছর মনু নদের তীরে মানববন্ধন ও আন্দোলন শুরু করে। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এবং কুলাউড়া চাতলাপুর চেকপোস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে আমদানি-রফতানির লক্ষ্যে ২০১৮ সালে রাজাপুর সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন হলে সওজ অধিদপ্তর মনু নদের ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পে ‘কুলাউড়া-পৃথিমপাশা-হাজীপুর-শরীফপুর সড়কের ১৪তম কিলোমিটারে ২ শত ৩২ দশমিক ৯৪ মিটার পিসি গার্ডার সেতু, সাড়ে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও জমি অধিগ্রহণ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার। কাজের ব্যয় ধরা হয় ৯৯ কোটি ১৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জন্মভূমি-ওয়াহিদুজ্জামান-নির্মিতি’নামের সিলেটের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালের জুন মাসের দিকে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে। এদিকে ২০২০ সালে কার্যাদেশ পাওয়া প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুর দুই পাশে সাড়ে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ পায় ‘জামিল-ইকবাল’নামের সিলেটের আরেকটি যৌথ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ভুমি অধিগ্রহণে নানা জটিলতা থাকায় পরবর্তীতে তিন দফায় কাজের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানা হয়। বর্তমানে কাজের মেয়াদ চলতি বছরের ১৮ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শরীফপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হারুন আহমেদ বলেন, উপজেলা শহরে প্রয়োজনীয় কাজে যেতে গেলে অনেক পথ ঘুরে যেতে হয়। আবার কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে পথেই অনেক সময় রাত হয়। আর একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রেও রয়েছে চরম বিড়ম্বনা। মানুষের দুর্ভোগ লাগবে রাজাপুর সেতু নির্মাণ হয়েছে ঠিক কিন্তু এই সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো উদ্বোধন করা হয়নি সেতুর দুইপাশের সংযোগ সড়কের কাজ শেষ না হওয়ার কারণে। সীমান্তবর্তী এলাকা শরীফপুরসহ হাজীপুর ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নের লোকদের বৃহৎ সুবিধার কথা চিন্তা করে অচিরেই যেন এই সড়কের কাজ শেষ করা হয় সেই দাবি আমাদের।

পৃথিমপাশা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কমরেড আব্দুল লতিফ, সাবেক ইউপি সদস্য আব্বাছ আলী, সমাজকর্র্মী ফয়জুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজাপুর সেতুর সংযোগ সড়কের কাজ কচ্ছপ গতিতে চলছে। এভাবে চলতে থাকলে কাজ শেষ করতে আরো অনেক সময় লাগবে। তিন ইউনিয়নের জনগণের স্বার্থে দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করতে হবে।

হাজীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাংবাদিক আব্দুল বাছিত বাচ্চু বলেন, সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হওয়ার পর রাজাপুর সেতুটি চালু হলে ভারতের কৈলাশহর থেকে চাতলাপুর চেকপোস্ট হয়ে আমদানি পণ্য দ্রুত চলে আসবে কুলাউড়া, জুড়ী, বিয়ানীবাজার, বড়লেখাসহ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে। আবার হাকালুকি হাওরের মাছ ও স্থানীয় ভাটাগুলোর ইট দ্রুত রপ্তানি হবে ভারতে। দূরত্ব কমে আসবে প্রায় সাড়ে ১১ কিলোমিটার। কমবে খরচ ও পণ্যের বাজার দর। চাতলাপুর স্থলবন্দরে বাড়বে আমদানি-রপ্তানি ব্যস্ততা, হবে কর্মসংস্থান। রাজাপুর সেতুটি উদ্বোধনের অপেক্ষার প্রহর গুনছে কুলাউড়াসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলার কয়েক  লক্ষাধিক মানুষ।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জামিল ইকবালের সাইট ম্যানেজার রাহাত ইসলাম বলেন, লাগাতার বৃষ্টি দেয়ায় সড়কের কিছু জায়গায় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সেটি আমরা দ্রুত মেরামত করে দিব। প্রজেক্ট ম্যানেজার আকাইদ হোসাইন বলেন, সংযোগ সড়কের কার্পেটিং ও দুইপাশে প্রটেক্টিভ ওয়ার্ক শেষ না হওয়া পর্যন্ত বৃষ্টি দিলে সড়কে ভাঙ্গন দেখা দিবে এটা কোন সমস্যা না। সড়কে পানি নিষ্কাষণের ব্যবস্থা করা হয়নি এজন্য বৃষ্টির পানি জমাট হওয়ার কারণে সড়কে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সেটি মেরামত করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, রাজাপুর সেতুর সংযোগ সড়কে ভাঙ্গনের বিষয়টি সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সড়ক ও জনপদ বিভাগ (মৌলভীবাজার) এর নির্বাহী প্রকৌশলী কায়ছার হামিদ বলেন, চলমান কাজে সড়কে ভাঙ্গনকৃতস্থানগুলো ঠিকাদারী  প্রতিষ্ঠান দ্রুত মেরামত করে দিবে। সাড়ে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়কে ২০টি কালভার্টের মধ্যে ১৬টির কাজ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে কাজের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কেন কাজ শেষ করতে পারেনি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা পেয়েছি, সেটা প্রক্রিয়াধীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *