জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের আদমপুর বিটের কালিঞ্জি এলাকায় উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও পুলিশের যৌথ অভিযানে রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের প্রায় পাঁচ একর জমিতে লাগানো ১২০০ কমলা গাছ কেটে দখলমুক্ত করা হয় ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার। এদিকে প্রায় ১ হাজার ২০০টি কমলা গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি সরেজমিন তদন্ত, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির প্রধান। কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রেঞ্জের অধীন আদমপুর বিটের কালিন্জি এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এ সময় কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো: আব্দুর রহমান এবং মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোসা; শাহীনা আক্তার। তদন্তকালে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: আসাদুজ্জামান, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিয়াজ মাহমুদ, কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ওয়াহিদুজ্জামান রাজু, বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং কমলগঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তদন্ত কমিটির প্রধান আশরাফুর রহমান বলেন, ‘এখানে কিছু গাছ কাটা হয়েছে। গাছ কাটার বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য রেকর্ড করেছি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে।’ তিনি জানান, তদন্তে ঘটনার প্রকৃত কারণ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা এবং আইনগত দিকগুলো খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত কমিটির সদস্য ও সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো: আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমি তদন্ত কমিটির প্রধানকে সহযোগিতা করতে এসেছি। কেউ যদি সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, পাকা রাস্তা বা অন্য কোনো অবকাঠামো তৈরি করে থাকে, সেগুলো আইন অনুযায়ী উচ্ছেদ করা হবে। এলাকায় একটি পুকুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছও রয়েছে। সবকিছু তদন্তের আওতায় আনা হবে।’
সরকার যখন প্রতিবছর ‘পরিবেশ বাঁচাও’ স্লোগান নিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করছে, ঠিক তখনই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে উচ্ছেদের নামে ১ হাজার ২০০ ফল দেওয়া কমলা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে খোদ বন বিভাগের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘ ৮ বছর ধরে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে নিয়মিত মাসোহারা (চাঁদা) দিয়ে তারা এই বাগান টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এবার আর্থিক সংকটের কারণে কিস্তির টাকা দিতে না পারায় প্রতিশোধের কারণে তাদের ফলের বাগানটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বন বিভাগের এই দ্বিমুখী ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রশ্ন বাগানটি যদি অবৈধই হয়ে থাকে, তবে রোপণের শুরুতে বা এক-দুই বছরের মধ্যে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? আট বছর ধরে গাছগুলোকে বড় হতে দিয়ে, ঠিক যখন ফল ধরার সময় হলো, তখনই কেন এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুরু থেকেই তারা বন বিট কর্মকর্তাকে নিয়মিত টাকা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে দাবি করা টাকা দিতে না পারায় তাদের পুরো স্বপ্ন কেটে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে।
বাগানের মালিক মোছা: সালমা বেগম দুই হাত মাথায় দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এই বাগান গড়ে তুলতে গত ৮ বছরে বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছিলাম। ভেবেছিলাম এবার ফল বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধ করব। অথচ বন বিভাগ আমাদের সব শেষ করে দিল। বাগান না কেটে যদি আমাদের ঘরে তালা দিয়ে পুড়িয়ে মারত, তাহলেও এত কষ্ট হতো না। এখন এই ঋণের বোঝা নিয়ে আমরা কোথায় যাব?’
সালমা বেগম ও তার স্বামী আলিম উল্লা জানান, বনের প্রায় ১০ কিয়ার (কানি) জমিতে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে তারা কমলা, পেঁপে ও লাউয়ের বাগান গড়ে তোলেন। আর মাত্র তিন মাস পর বাগান থেকে ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার ফল বিক্রি করার কথা ছিল। কিন্তু বন বিভাগের একটি অভিযানে তাদের সেই স্বপ্ন এখন ধ্বংসস্তূপ।
স্থানীয়দের দাবি, এই অভিযানের পেছনে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাও রয়েছে। কিছুদিন আগে বন বিভাগের কথিত লিজ বাণিজ্য ও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারের সময় এই ভুক্তভোগী পরিবার সাংবাদিকদের তথ্য দিয়েছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অথচ বনের জমিতে টাকার বিনিময়ে অলিখিতভাবে অন্যদের পান ও জুম চাষ করতে দেওয়া হলেও, সেখানে কোনো অভিযান চালানো হয়নি। গাছ কাটার পাশাপাশি তাদের একমাত্র পানি সেচের মেশিনটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানান। তাঁদের দাবি, চাঁদা না দেওয়ায় ফল ধরার সময়ই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাগানটি কেটে ফেলা হয়েছে। তবে বন বিভাগ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, সংরক্ষিত বনভূমিতে ব্যক্তিগতভাবে কোনো বাণিজ্যিক বাগান করা সম্পূর্ণ বেআইনি। ওই জমিতে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত ফলের বাগান, মৎস্য খামার ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল, যা বন আইনের পরিপন্থী। বনভূমি দখলমুক্ত করার অংশ হিসেবে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, কমলার বাগান উচ্ছেদ করা তারই অংশ।
বাগানটির মালিক দাবি করা আলিম উল্লা জানান, তাঁর দাদা বন ভিলেজার হিসেবে ওই এলাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় তাঁদের পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছে। ২০১৮ সালে তাঁরা কমলার বাগানটি গড়ে তোলেন। শুরুতে বন বিভাগের কোনো বাধা ছিল না, বরং সহযোগিতাও পেয়েছিলেন। আলিম উল্লার অভিযোগ, এবার গাছে ফল আসার পর বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় পুরো বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক প্রীতম বড়ুয়া জানান, সংরক্ষিত বনভূমিতে শুধু বনজ গাছই থাকবে। জবরদখল করে পান, কমলা, মাল্টা, আনারসসহ যেকোনো বাণিজ্যিক চাষ সম্পূর্ণ বেআইনি। বনের জমি দখল করে সেখানে ফলের বাগান, ফিশারি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। বনভূমি উদ্ধার করতে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রতি মাসেই এ ধরনের অভিযান হয়। চাঁদাবাজির যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ওই বাগানে এত দিন কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি, এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রীতম বড়ুয়া বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এখানে এসে বন বিভাগের জায়গা দখল হয়েছে দেখে অভিযানে নেমেছি।’
অন্যদিকে, সিলেট বন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান জানান, ‘১৯২০ সালের দিকে যখন প্রথম ভিলেজার সিস্টেম চালু হয়, তখন কেবল নিচু জমিতে ধান চাষের জন্য জমি দেওয়া হতো। পাহাড় বা টিলার ওপরে ফল বাগান করার কোনো নিয়ম বন আইনে নেই। বনের জমিতে কোনো ফল বাগান থাকবে না, সেখানে বনায়ন করা হবে। এই নীতি অনুযায়ীই এটি কেটে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।’
বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা এই অনিয়ম বা চাঁদা নেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকলে, তথ্য-প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। পরিবেশ রক্ষার নামে যেখানে বনায়ন করার কথা, সেখানে ফলন্ত ও উৎপাদনশীল ১২০০ গাছ কেটে ফেলার এই ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে চরম ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

