মাহফুজ শাকিল: কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গৃহীত প্রকল্প আলোর মুখ দেখার আগেই মনু নদীতে বিলীনের পথে শতবর্ষী কাউকাপন বাজার। ইতিপূর্বে ২০১৮ সালের বন্যায় বাজারের প্রায় ৩৬টি দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং বাজারের মধ্য খানে কটারকোনা-কাউকাপন-তারাপাশা সড়কে ভাঙ্গন দেখা দেয়। এদিকে প্রকল্প গ্রহণের ছয় বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও কাজ শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ভাঙ্গনকৃত স্থান দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন যানবাহনসহ স্থানীয় লোকজন। কাউকাপন বাজারের ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় লোকজন জানান, ২০১৮ সালের ১৫ জুন বাজারের প্রায় ৫০ ফুট জায়গা নদী গর্ভে বিলীন হয়। ৩৬টি দোকান সম্পূর্ণরুপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৩টি মার্কেটে ১৭টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভাঙনের পর ২০১৮ সালের ২৪ জুন তৎকালীন এমপি প্রয়াত আব্দুল মতিন, পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুস শহীদ ও মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী কাউকাপন বাজারে মনু নদীর ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ৪৫০ মিটার কাজের জন্য ৭ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকার আলাদা একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় আরাধনা এন্টারপ্রাইজ ও মুন ইন্টারন্যাশনাল নামে যৌথ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। প্রকল্প এলাকায় তিন বছরে ৪৩ শতাংশ শুধু ডাম্পিং কাজ করা হয়। কিন্তু ছয় বছর সময় অতিবাহিত হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কোনো উদ্যোগ নেই। বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে কাউকাপন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙ্গনকৃত স্থানে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনসহ এলাকার লোকজনসহ স্কুল-কলেজ মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীরা দূর্ভোগ নিয়ে চলাচল করছেন। এসময় বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, ভাঙ্গনকৃত স্থানে স্থানীয় উদ্যোগে পাঁচবার মেরামত কাজ করা হয়েছে। কাজটি যদি দ্রুত শুরু না করা হয় তাহলে মানুষ সীমাহীন দূর্ভোগে পড়বে এবং শতবর্ষী বাজারটি পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হবে। তারা আরো বলেন, কাউকাপন গ্রামের শত শত শিক্ষার্থীরা ভাঙ্গনকৃত স্থানের সড়ক দিয়ে হাজীপুর ইউনিয়নের নয়াবাজার কেসি স্কুল এন্ড কলেজ, সাধনপুর মাদ্রাসা, হরিচক প্রাইমারী স্কুল, সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও শমসেরনগরের বিএফ শাহিন কলেজে দূর্ভোগ নিয়ে যাতায়াত করেন। কাউকাপন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বিধান চন্দ্র দে বলেন, কাউকাপন বাজারে তৎকালীন সময়ে নদীপথে নৌকা দিয়ে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা পণ্য নিয়ে এই বাজারে আসতেন। একসময় এই বাজারের অনেক জৌলুস ছিল। অতীতে এই বাজারে শতাধিক দোকানপাট ছিল। বর্তমানে বাজারে ৬৫টি দোকান আছে। ২০১৮ সালের বন্যায় এই বাজারের মধ্যখানে ভাঙ্গন দেখা দেয়। সম্প্রতি বন্যায় ভাঙ্গনকৃত স্থানে আরো ৫-৬ ফুট নিচের দিকে দেবে যায়। তিনি আরো বলেন, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বাজারের কিছু দোকান ভিটার প্রভাবশালী লোকদের দিয়ে জমি অধিগ্রহণের কথা বলে আবেদনে স্বাক্ষর নেওয়া হয় কিন্তু পরবর্তীতে আবেদনের পাতা পরিবর্তন করে ভাঙ্গনকৃত স্থানে কাজ না হওয়ার জন্য পাউবো বরাবরে লিখিত আবেদন করা হয়। পরবর্তীতে বাজার কমিটির লোকদের নিয়ে আমরা ভাঙ্গনকৃত স্থানে কাজ শুরু করার জন্য দুই বছর আগে আরেকটি আবেদন পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবরে জমা দেই। কিন্তু আজও অবধি এই স্থানে কাজ শুরু করা হয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে। বর্তমান সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম মহোদয়ের সাথে বাজারের ভাঙ্গনকৃত অংশের কাজ শুরু করার জন্য যোগাযোগ করলে তিনি বলেছেন এ কাজের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ডিও লেটার দিয়েছেন।

হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাংবাদিক আব্দুল বাছিত বাচ্চু বলেন, জনশ্রুতি রয়েছে শত বছর আগে জনবসতি গড়ে উঠার পর কাউকাপন বাজারটি গড়ে উঠে। ২০১৪-১৫ সালেও এখানে বড় হাট বসতো। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে শুরু হয় ভয়াবহ ভাঙন। একে একে অসংখ্য দোকান নদীতে বিলীন হয়ে যায়। মাননীয় সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম এমপি মহোদয়ের প্রতি আকুল আবেদন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে নদী ভাঙনের হাত থেকে শতবর্ষী বাজারসহ এলাকাবাসীকে রক্ষায় প্রকল্প গ্রহণ করার জন্য।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. আল–আমিন বলেন, ২০২০ সালে কাউকাপন বাজারসহ ওই এলাকায় ৪৫০ মিটার কাজের জন্য টেন্ডার হয়। তিন বছর প্রকল্প এলাকায় মাটির নিচে ৪৩ শতাংশ কাজ করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। যোগসাজশ করে গোপনে আবেদন জমা দেয়ার বিষয়ে বাজারের ব্যবসায়ীসহ লোকদের আনীত অভিযোগ সঠিক নয়, এটার কোন প্রমাণ নেই।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্থ কাউকাপন বাজার এলাকা পরিদর্শন করে কাজ শুরু করার বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে আলোচনা করবো।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, সম্প্রতি কাউকাপন বাজারে ক্ষতিগ্রস্থ স্থানটি পরিদর্শন করেছি। বাজার রক্ষায় ইতিপূর্বে প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিন বছর আগে স্থানীয় লোকজন কাজের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে লিখিত আবেদন করার পর থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে জমি অধিগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। বাজারের জমির প্রকৃত মালিকরা যদি অধিগ্রহণ ছাড়া কাজ করতে দিবে মর্মে লিখিত আবেদন করেন তাহলে পুনরায় কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে বিগত সময়ে কাজ চলাকালীন সময়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় যদি কাজটি শেষ করা হতো তাহলে এখন এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

