মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলনে হামলার অভিযোগের পর এবার আহত আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে আন্দোলনের অন্যতম নেতা গীতা রানী কানুকে। বুধবার রাতে তাকে আটক করে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, হামলায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধেই পরিকল্পিতভাবে এ মামলা করা হয়েছে। এর আগে সোমবার চৌমুহনায় মানববন্ধন ও র্যালিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারীদের দাবি, হামলায় ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজন মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, গীতা রানী কানুকে প্রধান আসামি করে চার থেকে পাঁচজনের নাম উল্লেখ এবং আরও ছয় থেকে সাতজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা হয়েছে। বুধবার রাতে প্রধান আসামি গীতা রানী কানুকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এজাহার থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বাদী হয়ে গীতা রানী কানুসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৪২৭, ৩৭৯, ৫০৬ ও ১১৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। এসব ধারায় বেআইনি সমাবেশ, মারধর করে জখম, ভাঙচুর ও ক্ষতিসাধন, চুরি এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় অন্যান্য আসামীরা হলেন জনকলাল দেশোয়ারা, আকাশ গোয়ালা, বিশ্ব প্রসাদ গোয়ালা, গোপাল যাদবসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৬ থেকে ৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা বেআইনিভাবে দলবদ্ধ হয়ে লেবার হাউসের ভেতরে প্রবেশ করে বাদী নিপেন পালের ওপর হামলা ও মারধর করেন। এতে তিনি জখম হন। এ সময় আসামিরা নগদ ৫ হাজার ৭০০ টাকা চুরি করেন এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ২০ হাজার টাকার ক্ষতি করেন। পরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তারা চলে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। চা শ্রমিক নেতা গীতা রানী কানু বলেন, তারা প্রথমে ডিডিএল ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের দিকে র্যালি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং এজন্য পুলিশের অনুমতিও নেওয়া হয়েছিল। পরে চা শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ের সামনের সড়কের বিপরীত পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের ওপর হামলা করা হয়। তার অভিযোগ, প্রথমে চা শ্রমিক নেতা দুলাল হাজরা তাদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন। পরে চা শ্রমিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী ও নেতা সুবাস রবিদাস তাদের ধরে ইউনিয়ন কার্যালয়ের গেটের কাছে নিয়ে যান। সেখানে ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল, বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা, সুমন হাজরা ও সুমন তাঁতীসহ কয়েকজন তাদের মারধর করেন। গীতা রানী দাবি করেন, হামলায় ১০ থেকে ১২ জন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে জনকলাল দেশোয়ারা, রাধামোহন নুনিয়া ও তিনি মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, হামলার পর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকায় প্রথমে মামলা করতে পারেননি। পরদিন থানায় গিয়ে জানতে পারেন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে। আরেক চা শ্রমিক নেতা আকাশ দোষাদ বলেন, আমাদের ওপর হামলার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। পুলিশের উপস্থিতিতে হামলার ঘটনা ঘটলেও পুলিশ তাদের রক্ষা করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একইসঙ্গে হামলাকারীরাই চা শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয় ভাঙচুর করে সেই দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা চা শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে গিয়ে অফিস দখলের উদ্দেশ্যে চিৎকার-চেঁচামেচি ও গালিগালাজ করেছেন। এ কারণে আমি বাদী হয়ে মামলা করেছি। নিপেন পাল জানান, আন্দোলনকারীরা কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেছেন কি না, সেই ঘটনার কোনো ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে নেই। কার্যালয়ের ভেতরেও কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই বলে জানান তিনি। আহত আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ আহত হলেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা মামলা করা যাবে না, এমন নয়। তবে সংগঠনের কার্যালয়ে গিয়ে গালিগালাজ বা বিশৃঙ্খলা করার অধিকার কারও নেই। ঘটনার সময় চা শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয়ের গেটের সামনে ছিলেন দাবি করে নিপেন পাল বলেন, তিনি কাউকে মারধর করেননি। কার্যালয়ের ভেতরে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আহমেদ ফয়সল জামান বলেন, আহত অবস্থায় তিনজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরদিন চিকিৎসা নিয়ে তারা বাড়ি ফিরে গেছেন। জনকলাল বলেন, আমাদের উপর মামলা হওয়ার পর নিরাপত্তার অভাবে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে অন্য জায়গায় চিকিৎসা নিয়েছি। চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা, ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বাতিল, ভূমির অধিকার ও ইউনিয়ন নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন চলমান রয়েছে। তবে ওই দিনের কর্মসূচিতে “অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি”র দাবিও সামনে আসে বলে জানিয়েছেন ইউনিয়ন নেতা নিপেন পাল। তাঁর দাবি, মজুরি আন্দোলনের আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

