মৌলভীবাজারে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নিমজ্জিত বোরো ধান

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজার জেলায় পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতে হাকালুকি হাওরে শত শত একর কৃষকের সোনালী স্বপ্ন বোরো ধান নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া  ফসল, মৎস্য খামার ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কুলাউড়ার গোগালীছড়া বাঁধ ভেঙে উপজেলার সদর ও জয়চণ্ডী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। প্লাবিত গ্রামের মধ্যে সদর ইউনিয়নের বাগাজুরা, হাসনপুর, শ্রীপুর, করেরগ্রাম, মিনারমহল, সৈয়দপুর, গাজিপুর, পুরন্দপুর, হরিপুর, বড়কাপন এবং জয়চণ্ডী ইউনিয়নের দানাপুর, কামারকান্দি ও লামাগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ১০০ বিঘা আউশ ও বোরো ধানের ক্ষেত, আউশের বীজতলা এবং শতাধিক পুকুর প্লাবিত হয়ে মাছ পানিতে ভেসে গেছে। কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বলেন, বাঁধ ভাঙনের কারণে একাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে মৎস্য খামার, বোরো ধান ও আউশের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মহি উদ্দিন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে জানান, পাহাড়ি ঢলে ১০-১৫টি এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে এবং কয়েকটি সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আকস্মিক বন্যায় পানিবন্দি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেড় শতাধিক মানুষের মাঝে সরকারের পক্ষ থেকে দশ কেজি করে ত্রাণ সহায়তা  চাল বিতরণ করা হয়েছে।

কমলগঞ্জ উপজেলায় গত দুদিনের টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চলের বোরো ধান ও সবজি ক্ষেত নিমজ্জিত হচ্ছে। পতনঊষার ইউনিয়নের কেওলার হাওরের পাশাপাশি নিম্নাঞ্চল এলাকায় ফসল ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত এই চিত্র পাওয়া গেছে। এছাড়া মুন্সিবাজার, শমশেরনগর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলেও বোরোধান এবং সবজি ক্ষেত নিমজ্জিত হচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোধান চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে বৃষ্টিপাত ও ঢলে বোরো ধান সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়েছে ৭০ হেক্টর ও আংশিক নিমজ্জিত হয়েছে ৩৫০ হেক্টর। সবজি ক্ষেত নিমজ্জিত হওয়ার সর্বশেষ তথ্য এখনও আসেনি।

কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বোরো ধান ৭০ হেক্টর ও আংশিক ৩৫০ হেক্টর নিমজ্জিত হয়েছে।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: খালেদ বিন অলীদ জানান, কমলগঞ্জে ধলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও বিপদ সীমার দেড়ফুট নিচে রয়েছে। নদ নদীর পানি সার্বক্ষনিক নজরদারি করা হচ্ছে।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আসাদুজ্জামান বলেন, ঝড় ও বৃষ্টিপাতে নিম্নাঞ্চলে কেওলার হাওরে কিছু বোরোধান নিমজ্জিত হয়েছে। বিদ্যুৎ লাইনের ক্ষয়ক্ষতি ও গাছগাছালি ভেঙ্গে সড়কপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও পরবর্তীতে সংস্কার করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা হয়েছে।

বড়লেখা উপজেলায় প্রবল বেগে বয়ে যায় কালবৈশাখী ঝড়ে বিভিন্ন সড়কে, বিদ্যুৎ লাইনে ও ঘরবাড়ির ওপর ভেঙ্গে পড়ে ব্যাপক গাছপালা। কুলাউড়া-চান্দগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সড়কে ওপর উপড়ে পড়ে বড়বড় গাছ। রতুলি-কাঠালতলী সড়কের মধ্যবর্তী স্থানে রাস্তার ওপর গাছ পড়ায় উভয় পাশে আটকা পড়ে সহস্রাধিক যানবাহন। প্রায় একঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে সড়কের গাছ অপসারণ করেছে দমকল বাহিনীর লোকজন।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কালবৈশাখী ঝড়ে হাজার হাজার গাছপালা বিভিন্ন বাড়িঘরে, রাস্তায় ও বিদ্যুৎলাইনের ওপর পড়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে অনেকের বাড়িঘর। লন্ডভন্ড হয়ে গেছে বিদ্যুৎ লাইন। এদিকে উপজেলার বিভিন্ন স্থানের গ্রামীণ রাস্তায় ও বিদ্যুৎ লাইনের ওপর অসংখ্য গাছ ওপড়ে পড়েছে। উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর, দক্ষিণ শাহবাজপুর, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ, দক্ষিণভাগ উত্তর, তালিমপুর ও বড়লেখা সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় তিন শতাধিক বসতবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।

সোমবার রাত সোয়া ৯টার দিকে শ্রীমঙ্গলে ঝড়ো হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৫৬ কিলোমিটার (৩০ নটিক্যাল মাইল) রেকর্ড করা হয়। এ ঝড়ো হাওয়ায় বিদ্যুতের লাইন, রাস্তার উপর গাছপালা এবং হালকা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মী ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের গাছ অপসারণ ও বিদ্যুৎ লাইন মেরামতের কাজ করতে দেখা গেছে।

জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, জেলার ৭ উপজেলার জন্য ইতিমধ্যে ১০০ মেট্টিক টন চাল এবং নগদ ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলার ৭ উপজেলার হাওর এলাকায় ২৭ হাজার ৩ শ ৫০ হেক্টর এবং নন হাওর এলাকায় ৩৫ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছিলো। ইতিমধ্যে হাওর এলাকায় ২২ হাজার ৪শ ৯ হেক্টর এবং নন হাওর এলাকায় ৭ হাজার ৬ শ’ ৪৯ হেক্টর জমির ধান কাটা সমাপ্ত হয়েছে। এছাড়া সম্ভাব্য বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বর্তমানে ৩২১ টন জি আর চাল, ৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা মজুদ রয়েছে। গৃহ নির্মাণ মঞ্জুরী হিসেবে ১৬৩ বান্ডিল ঢেউটিন এবং নগদ ৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা মজুদ রয়েছে। এছাড়া ৫ শ মেট্টিক টন চাল, নগদ ২০ লক্ষ টাকা এবং গৃহ নির্মাণ মঞ্জুরি বাবদ ১ হাজার বান্ডিল ঢেউটিন এবং নগদ ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *