এম. মছব্বির আলী/মাহফুজ শাকিল:
সমাজের সকল শিশুরা একসঙ্গে পড়ে স্কুলে। তাদের সাথে পড়ে কবিতা, বিশাল, রনবীর, নীরব, রিমি, নন্দিনী, বিরাট। একজন সহপাঠী হিসেবে বসে পাশাপাশি সিটে। একসঙ্গে খেলাধুলাও করে। তবে বৈষম্য শুধু হোটেলে। হরিজন সম্প্রদায়ের সন্তান বলে ওইসব শিশুদের হোটেলে ঢুকতে দেওয়া হয়না বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিকভাবে এমন বৈষম্য তৈরি করে রেখেছেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার কয়েকটি হোটেল মালিক।
স্কুলের বন্ধুরা যখন হোটেলে বসে খাবার খায়, টিফিন করে, তখন কবিতা-বিশালরা বসে হোটেলের বাইরের বেঞ্চে। ওখানেই কাগজে তাদের দেওয়া হয় খাবার। তারা প্রত্যেকই কুলাউড়া পৌর শহরের বিভিন্ন স্কুলে পড়ালেখা করে। ওই শিশুরা কুলাউড়া পৌর শহরের পরিনগর রেলওয়ে হরিজন কলোনীতে বসবাস করেন।
হরিজন সম্প্রদায়ের সন্তানরা জানায়, স্কুলের টিফিনের সময় বা ছুটির সময় তারা হোটেলে বসে খেতে পারে না। তাদের বন্ধুরা একই সঙ্গে এসে হোটেলে প্রবেশ করলেও তাদের ঢুকতে দেওয়া হয় না। তাদের কাগজে বা আলাদা নিজস্ব পাত্রে খাবার নিয়ে হোটেলের বাইরে বসতে হয়।
হরিজন সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিতের অভিযোগ এনে প্রতিকার চেয়ে গত ২৩ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। যার অনুলিপি জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও ওসি বরাবর পাঠানো হয়।
অভিযোগ উঠেছে, মূল স্রোতের সাথে বসে হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজনসহ স্কুলে পড়–য়া তাদের ছেলে মেয়েদের হোটেলে খেতে দেয়া হয়না। হোটেলের বাইরে তাদের নিজস্ব পাত্রে খেতে দেয়া হয়।
এদিকে হোটেল মালিকদের অভিযোগ, হরিজনদের খাবার দিতে তাদের কোন সমস্যা নেই। কিন্তু হোটেল আসা সিংহভাগ ধর্মপ্রাণ মুসলমানসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজন নিয়মিত হোটেলে আসেন। তখন তাদের খেতে অসুবিধা হওয়ার কারণে হরিজনদের জন্য হোটেলের বাইরে আলাদা বেঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারণ তারা হোটেলে দলবদ্ধভাবে মদপান করে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা শুরু করে। তাদের এইসব আচরণের কারণে হোটেলে থাকা অন্যান্য ভোক্তাদের নানা অসুবিধা হয়। এসময় তাদের আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের নিয়মিত গ্রাহকরা হোটেল থেকে চলে যান এতে হোটেল মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হন।
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের কুলাউড়া শাখার সভাপতি মৎলা বাসপর অভিযোগ করে বলেন, আমরা হরিজন সম্প্রদায় এসব সামাজিক বা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমরা শহরের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করি। আমাদের ছেলে মেয়ে শহরের বিভিন্ন স্কুলে পড়ালেখা করে। কিন্ত স্কুল টিফিন এর সময়ে অন্যান্য ধর্মের বাচ্চারা হোটেলে ভিতরে বসে খায় কিন্তু আমাদের ছেলে মেয়েরা স্কুল ড্রেস পরে গেলেও তাদেরকে কাগজে নাস্তা দেওয়া হয়। আমরা হরিজন সম্প্রদায় বলে কুলাউড়ার হোটেলগুলোতে আমাদেরতো খেতে দেয় না। এখন দেখি আমাদের শিশুদের সাথেও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। তাই আমরা এর প্রতিবাদ করছি। আমরা উপজেলা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি, আমাদের মৌলিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যেন গ্রহণ করা হয়।
সরেজমিন পৌর শহরের ইস্টার্ণ ও পাকসী রেষ্টুরেন্টে গেলে কথা হয় কয়েকজন ভোক্তার সাথে। এসময় ভোক্তা হাজী হারিস আলী, রাজুম আলী রাজু, আজিজুর রহমান রুকন, মাসুদ বক্স, রেদওয়ান বক্স রাহাত বলেন, হরিজনদের হোটেল থেকে খাবার দিতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। তবে তাদের জন্য আলাদাভাবে খাবার দেয়ার ব্যবস্থা করা হউক। কারণ পৌর শহরের ব্যস্ততম সড়কের পাশে পড়েছে ইস্টার্ণ ও পাকসী রেষ্টুরেন্ট। সেখানে প্রতিদিন ফজরের পর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড থেকে কয়েকশত মুসল্লীসহ লোকজন নাস্তাসহ খাবার খেতে আসেন। এসময় হরিজনরা মদপান করে দলবদ্ধভাবে হোটেলে প্রবেশ করে মাতলামি শুরু করে এবং মুসল্লীদের পাশে বসে সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে উল্টোপাল্টা আচরণ শুরু করে। এতে মুসল্লীদের সাথে স্বাভাবিক ভাবেই তাদের সমস্যা দেখা দেয়। তাদের এসকল আচরণ নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে আমরা হোটেলে আসা বন্ধ করে দিবো।
কুলাউড়ার ইস্টার্ণ রেষ্টুরেন্টের মালিক মোঃ শাহাজান খাঁন বলেন, হরিজনরা আমাদের হোটেলের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা সঠিক নয়। তাদের নিয়মিত হোটেল থেকে পার্সেল বা হোম ডেলিভারি দেয়া হয়। আর শিক্ষার্থীরা স্কুল টিফিন বা ছুটি শেষে শুধু নাস্তা পার্সেল হিসেবে নিয়ে যায়। হরিজনরা বিভিন্ন সময়ে হোটেলে এসে ঝামেলা সৃষ্টি করলে আমাদের সিংহভাগ ভোক্তা তাদের আচরণে হোটেল থেকে চলে যান। এতে আমরা আর্থিকভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি।
কুলাউড়া হোটেল মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক মোঃ লোকমান মিয়া বলেন, আমাদের মধ্য কোন বিভাজন বা বৈষম্যে নেই। আমরা ব্যবসা করতে এসেছি ব্যবসা করবো। হরিজনদের পূর্ব পুরুষ থেকে তারা হোটেল থেকে পার্সেল নিয়ে যায়। এখন তাদের দাবি, তারা হোটেলে সবার সাথে চেয়ারে বসে খেতে চায় কিন্তু হোটেলে থাকা অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকদের রয়েছে আপত্তি। ভোক্তার বলছেন, হরিজনদের সাথে বসে যদি তাদের খাবার দেয়া হয় তাহলে তারা হোটেলে আসা বন্ধ করে দিবে এবং হোটেল বয়কট করবে। স্কুল পড়–য়া ছেলে মেয়েদের হোটেল থেকে খাবার খেতে না দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে যদি স্কুলে পড়–য়া ছেলে মেয়েদের হোটেলে খাবার না দেয়া হয় তবে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
কুলাউড়া ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম আতিকুর রহমান আখই বলেন, হরিজনরা আমাদের সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা কোন সময়ই তাদের আলাদা করে দেখিনি। হোটেলে বসে তাদেরকে খাবার না দেয়ার একতরফা যে অভিযোগ হোটেল মালিকদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে তা সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, শতকরা ৯০ শতাংশ ভোক্তাদের আপত্তির কারণে এবং বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য ধর্মালম্বীদের সাথে তাদের বাকবিতন্ডাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এড়াতে ও আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে তাদেরকে নিরুৎসাহিত করা হয়। হোটেলের নিরাপত্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হবে না মর্মে নিশ্চয়তা পেলে অবশ্যই হোটেলে বসে খেতে হোটেল মালিকদের কোন আপত্তি নেই। তবে সত্যিকার অর্থে যদি কোন শিক্ষার্থীর সাথে বৈষম্যেমূলক আচরণ করা হয় তাহলে উপযুক্ত প্রমাণ দেখাতে পারলে হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো। যেহেতু বিষয়টি স্পর্শকাতর সেহেতু উপজেলা প্রশাসন, পৌর মেয়র, ব্যবসায়ী সমিতি, হোটেল মালিক সমিতি ও হরিজনদের নিয়ে বসে আলোচনার মাধ্যমে সুন্দর একটি সমাধানের পথে আমরা এগোতে চাচ্ছি।
কুলাউড়া ইয়াকুব তাজুল মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক ও রুদ্রবীণা সংগীত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ড. রজত কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, হরিজন সম্প্রদায় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে ধারনা তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মানুষ সভ্যতার ধারাবাহিকতায় অগ্রসর হচ্ছে, বিভিন্ন কাজের মতো তাদের কাজও একটি দায়িত্ব তারা তা আন্তরিকতার সাথে পালন করে। হোটেলে, রেষ্টুরেন্টে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি মানবতা বিরোধী ও অযৌক্তিক। এরকম অনেক কাজ অনেকেই করে যা এমনতর অস্পৃশ্য কিন্তু তাদেরকে চেনা যায় না। ভাল পোষাক পরে আসার কারনে তাদেরকে চেনাও যায় না বা কেউ জানতে বা চিনতে যায়না বা চায়না। পৃথিবী ও সভ্যতা অগ্রসর হচ্ছে তাই সবাইকে মানুষের অধিকার দিয়েই বিবেচনা করতে হবে। এতে যদি কারো মনে কোন সংশয় হয় সে ক্ষেত্রে একই টেবিলে খেলেও কোন অসুবিধা মনে না করাই উচিৎ মনে করি। তারাও আপনার আমার সন্তানের মতোই সন্তান।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, আমি একটি হোটেল পরিদর্শনও করেছি ও হোটেল মালিককে বলেছি যে, সংবিধান বা আইনের কোন জায়গায় কি এমন কথা আছে কিনা যে হরিজন বা পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সাথে একত্রে বসে খাওয়া যাবে না। তাই সবাইকে বলেছি এভাবে কোন জাতিকে বৈষম্য করা যাবে না।
এ বিষয়ে পৌরসভার মেয়র অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী সমিতি ও হোটেল মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দরা আমার সাথে কথা বলেছেন। আমি ন্যায়সঙ্গত একটি সমাধানের জন্য ইউএনওসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি। শীঘ্রই সৃষ্ট সমস্যার একটি সন্তোষজনক সমাধান করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মাহমুদুর রহমান খোন্দকার বলেন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ হোটেলে একসাথে বসে খেতে পারবে। এতে কোন বাঁধা নেই, এখানে কোন জাতিকে হেয় করে দেখা চলবেনা। হরিজনদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর হোটেল মালিকদের ডেকেছি, তখন তাদের নির্দেশনা দিয়েছি, কাউকে হেয় না করে সুন্দর পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য।

