সুলতান মনসুরকে আটকের খবরে স্বস্তিতে বিএনপি নেতাকর্মীরা, বিচারের দাবি

মাহফুজ শাকিল : কানাডা থেকে দেশে ফিরেই আটক হলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি ও আওয়ামীলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। ৩০ সেপ্টেম্বর সোমবার ভোরে কানাডা থেকে দেশের ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে তাকে আটক করে ডিবি পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে জানান, ‘কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইমিগ্রেশন থেকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদকে ডিবির হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবো এবং কোথায় কী অভিযোগ আছে তা যাচাই-বাছাই করব’।

গত বছরের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশে যুবদল নেতা শামীম হত্যা মামলায় ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।   সোমবার বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাগীব নূর রিমান্ডের এ আদেশ দেন। সোমবার  তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তন্ময় কুমার বিশ্বাস। শুনানি শেষে বিচারক তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদেশ দেন।

সুলতান মনসুরের পরিবার জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরেই সুলতান মনসুর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ভ্রমণে ছিলেন। ছাত্র আন্দোলনের অনেক আগে থেকেই তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা নেই।

এদিকে সুলতান মনসুরকে আটকের খবরে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের দলের নেতাকর্মীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা সুলতান মনসুরকে বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্য করছেন। কারণ ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়ে প্রতারণা করে সুলতান মনসুর সংসদে গিয়ে সুর পাল্টিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামীলীগের গুনকীর্তন করতে দেখা গেছে। ওই নির্বাচনে কুলাউড়ায় বিএনপির তিন নেতা বেলায়েত হোসেন চৌধুরী শাহিন, ইউপি সদস্য চেরাগ আলী ও মোস্তফা মিয়া আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হামলার স্বীকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এমনকি বিএনপির প্রায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী হামলা-মামলার শিকার হয়ে পুলিশি ভয়ে বনে, জঙ্গলে, কবরস্থানে রাত্রীযাপন করেছিলেন।

২০১৮ সালে কুলাউড়ার ডাকবাংলো মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তিনি ধানের শীষে ভোট ভিক্ষা চেয়ে বলেন, মাত্র ২ কোটি টাকার মামলায় একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কারাগারে আর ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ কোটি কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করছে। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা নিজ কানে শুনেছেন। এমন অবাক করা বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা তাঁর জন্য জানপ্রাণ দিয়ে মাঠে কাজ করে তাকে বিজয়ী করেন। কিন্তু নির্বাচনের পর তিনি ডিগবাজি দিয়ে বলতে শুরু করেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করেন। আওয়ামীলীগ আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করেনি। আমিও আওয়ামী লীগ ছেড়ে অন্য কোনো দলে যোগ দেইনি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে লালন করে রাজনীতি করছি। যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়েই রাজনীতি করে যাবো। কোথাকার এক মেজর স্বাধীনতার ঘোষণা কিভাবে করে? এদেশে রাজনীতি করতে হলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে মেনে রাজনীতি করতে হবে। এমপি নির্বাচিত হবার পর স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করতে থাকেন সুলতান মনসুর। ২০১৮-২৩ সাল পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকবার তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় আসেন। স্থানীয় জনগন থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন থাকায় তাকে নিয়ে চলে নানা সমালোচনা।

গত একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হন সুলতান মনসুর। কিন্তু সংসদে নিজের ভূমিকা ছিল আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের মতো। সংসদে তাঁর কথাবার্তা, আচার-আচরণ, পোশাক পরিচ্ছদে যেন পরিলক্ষিত হয় তিনি যেন মুজিব আদর্শের এক অগ্রসৈনিক। সংসদে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামীলীগ সরকারের গুনকীর্তন করতে দেখা গেছে। ওইসময় তাঁর এমন বিতর্কিত কর্মকান্ডে বিএনপির নেতাকর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়।

সুলতান মনসুর আটকের পর এক প্রতিক্রিয়ায় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে সুলতান মনসুর আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি করে ভোট ভিক্ষা চেয়ে এমপি হন। তিনি বলেছিলেন, সংসদে গিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কথা বলবেন। কিন্তু তিনি সংসদে গিয়ে একদিনের জন্যও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কথা বলেননি। সুর পাল্টিয়ে তিনি শেখ হাসিনার সরকারের গুনকীর্তনে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর এমন কর্মকান্ডে ওইসময় বিএনপির নেতাকর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। এখন তিনি আটক হওয়ার খবরে কুলাউড়াতথা সমগ্র জেলা জুড়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং কিছুটা হলেও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ লাগব হয়েছে। কর্মের ফল সবাইকে ভোগ করতেই হবে।

উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সুফিয়ান আহমেদ বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট ভিক্ষা চেয়ে এমপি হয়ে সংসদে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদানকে অস্বীকার করেছেন। এমনকি ছাত্রদলকে নিয়েও কটুক্তি করেছেন। বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করার পরামর্শ দিয়ে বলেন প্রধানমন্ত্রী আবেদনটি বিবেচনা করবেন। তিনি আরো বলেন, সুলতান মনসুর ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করলে আমাদের নেতাকর্মীরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করে। আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপির ১২টি অফিস ভাংচুর করে জ¦ালিয়ে দেয়। এতকিছু করার পরও সুলতান মনসুর আমাদের নেতাকর্মীদের সাথে প্রতারণা করেছেন। তাঁর বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডে আমরা কুলাউড়াবাসী লজ্জিত। তাঁর সময়কালে সরকারি টিউবওয়েল বাণিজ্যসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক হরিলুট হয়েছে। এখন তার আটক হওয়ার খবরে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও আমরা মন থেকে সুলতান মনসুরকে ঘৃণা করছি এবং তার বিচার দাবী করছি।

কুলাউড়ার হাজীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আব্দুল বাছিত বাচ্চু লিখেন, অনেক শান্তি পাইলাম। বিএনপি এবং জননেতা তারেক রহমান এর এত বড় দুশমন আর আছেনি আমার জানা নেই।

কুলাউড়া থানা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম খান লিখেন, ডিগবাজ জাতীয় মীরজাফর সুলতান মনসুর ডিবি হেফাজতে। যাকে নির্বাচিত করার জন্য বিএনপি নেতা শাহীন চৌধুরী আর মোস্তফা ভাই জীবন দিয়েছিলেন। উনাকে রিমান্ডে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি করলে তাদের আত্মা শান্তি পাবে।

উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, বর্তমান কানাডা প্রবাসী এম ফয়েজ উদ্দিন লিখেন, সত্যিকারের আনন্দে আজ আনন্দিত কুলাউড়াবাসী। কুলাউড়ার কুখ্যাত পল্টিবাজ নেতা সুলতান মনসুর গ্রেফতার। কানাডায় কেউ তেলমর্দন করেনি দু-একটা চাটুকার ছাড়া। তাই বেচারা ভাসানীর ধানের শীষ নিয়ে কারাগারে।

উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক সুলতান আহমদ টিপু লিখেন, জাতীয় বেঈমান সুলতান মনসুরের আরো হিসাব ছাত্রদলের কাছে আছে। কুলাউড়ার মানুষ আমরা এই মুনাফিককে কখনো মাফ করবো না।

উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে সুলতান মনসুর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে মৌলভীবাজার-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সুলতান মনসুর বিজয়ী হন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্ধিতা করে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক না পেয়ে তিনি নির্বাচনে অংশ নেননি।

সুলতান মনসুর ৫ দিনের রিমান্ডে

দেশে ফেরার পথে গ্রেফতার, ডিবি হেফাজতে সুলতান মনসুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *