পাথারিয়া বনে হাতি বিলুপ্তি রোধে প্রয়োজন পুরুষ হাতি

মাহফুজ শাকিল: মৌলভীবাজারের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার এক প্রান্তজুড়ে পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট। এর অধীনে পড়েছে জুড়ীর লাঠিটিলা বন। এই পাথারিয়া (লাঠিটিলায়) বনে একসময় বেশ কয়েকটি হাতি ছিল। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে এ বনে টিকে আছে এখনো তিনটি বন্য মাদি হাতি।

একমাত্র পুরুষ হাতিটি ২০১২ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মারা যাওয়ার পর থেকেই পাথারিয়া বনে হাতি বিলুপ্তির আশঙ্কা তৈরি হয়। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা শেষ তিনটি মাদি হাতি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। গাজীপুরের সাফারি পার্কসহ দেশের অন্যান্য স্থান থেকে পুরুষ হাতি আনার উদ্যোগ নিচ্ছে তারা।

এ ব্যাপারে বন বিভাগের পক্ষ থেকে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলী রেজাকে প্রধান করে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষায়িত কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবিরকে। সম্প্রতি লাঠিটিলা বনের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনসহ এ বিষয়ে বনে বসবাসকারী লোকজনের (ফরেস্ট ভিলেজার) সঙ্গে মতবিনিময় করেন কমিটির সদস্যরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাথারিয়া বনে পুরুষ হাতি নেই। পুরুষ হাতির অভাবে বনের হাতি বিলুপ্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

কারণ এই বনের বন্য হাতিদের একটি অংশ পুরুষ হাতি ছিল। কিন্তু পুরুষ হাতি মারা যাওয়ায় মাদি হাতির বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না। আর বংশবৃদ্ধি না হলে এই বন থেকে হাতি একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হাতি বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হলে এই বনে অন্তত একটি পুরুষ হাতি আনা খুবই জরুরি। এতে প্রাকৃতিক বনটি নিরাপদে থাকবে।

প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতায় গঠিত বিশেষায়িত কারিগরি কমিটি গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী এ বনাঞ্চল পরিদর্শন করেন। এ সময়ে কমিটি পাথারিয়া বন হাতি পুনর্বাসনের উপযোগী, বনাঞ্চলের অবকাঠামো, খাদ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্ভাবনা যাচাই করে। পরে স্থানীয় লাঠিটিলা বিট কার্যালয়ের সামনে মতবিনিময়সভা করেন।

মতবিনিময়সভায় বক্তব্য দেন দুবাই সাফারি পার্কের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলী রেজা খান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে মানুষের নির্যাতনের শিকার কিছু পোষা হাতি বন বিভাগ উদ্ধার করে গাজীপুরের সাফারি পার্কসহ অন্যান্য স্থানে রেখেছে। সেগুলোর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। সে লক্ষ্যে পাথারিয়া বনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। পুনর্বাসনের বিষয়ে কাজ চলমান আছে।

কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আলী রেজা খান বলেন, উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে হাতি থাকবে না। সুষ্ঠু পরিচর্যার জন্য এখানে (পাথারিয়া) কয়েকটা হাতি আনা হবে। ওই হাতিদের জন্য প্রথমে একটি নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। সেখানে তারা বিচরণ করবে। একটি হাতি দিনে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার জায়গা হাঁটে। সেটুকু জায়গা থাকতে হবে। বন্যহাতিগুলো তাদের সঙ্গে মিশে কি না সেটা পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি মিশে তাহলে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।

আলী রেজা খান আরো বলেন, হাতিদের পুনর্বাসনের জন্য এখানে জলাধার, চিকিৎসাকেন্দ্র ও কিছু স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। মাহুত (হাতি দেখাশোনাকারী ব্যক্তি) দিয়ে হাতিদের বশে আনার ব্যবস্থা থাকবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হাতিদের রাখার চেষ্টা করা হবে। এখানে হাতির অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হবে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার হাতিরা একই বংশের। হাতিদের স্মরণশক্তি খুবই প্রখর। এ বনে ২০০-৩০০ বছর আগেও হাতিদের আবাসভূমি ছিল। সরকার হাতিদের এখানে পুনর্বাসন করতে চায়। এটি একটি ভালো উদ্যোগ।

পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন বিশেষায়িত কমিটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মোখলেছুর রহমান, আরণ্যক ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী পরিচালক মো. আব্দুল মোতালেব, ঢাকার বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্লাহ পাটুয়ারী, ঢাকা কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক জহির উদ্দিন আকন, কমিটির সদস্যসচিব সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর, সদস্য বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের (মৌলভীবাজার) বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম, বন্যপ্রাণী গবেষক মোহাম্মদ আশিকুর রহমান সমি, আইইউসিএন বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মোহাম্মদ সুলতান আহমেদ, জুড়ী রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল হুসাইন প্রমুখ।  পরিদর্শনকালে হাতি পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট এলাকায় হাতি সংরক্ষণের সম্ভাবনা, স্থানান্তর প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্পর্কে পরামর্শ গ্রহণ করা হয়।

পাথারিয়া বনের লাঠিটিলায় গিয়ে ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তাদের কাছ থেকে জানা যায়, পাথারিয়া বনটি বাংলাদেশ ও ভারতজুড়ে বিস্তৃত। দীর্ঘ চার যুগ আগে ভারতের আসাম রাজ্য থেকে আসা একদল বন্যহাতি বিচরণ করতো পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টে। ওইসময় এই দলে নয়টি হাতি ছিল। এরমধ্যে আটটি মাদি হাতি ও একটি পুরুষ হাতি। দলের রাজা ছিল পুরুষ হাতিটি। উচ্চতার দিক থেকে সেটি ছিল সবচেয়ে বড়। এক সময় এই হাতিগুলো ছিল ভারতের এক মালিকের পোষা। হাতির মালিক মারা যাওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়ে হাতির দলটি। পরে মালিকের ছেলে হাতিগুলোকে আসামের বনে ছেড়ে দেন। বনটির নাম দুহালিয়া হিল কিট। তখন এই দলে ছিল সাতটি হাতি। প্রজননক্রমে দুটি হাতি বেড়েছিল, সেই দুটি ছিল মাদি হাতি। পুরুষ হাতির মৃত্যুর পর পাথারিয়া বনের লাঠিটিলায় বর্তমানে তিনটি বন্যহাতি আছে। এর মধ্যে বছরখানেক আগে একটি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। পরে বন্যপ্রাণী বিভাগের লোকজন গিয়ে এই হাতিকে চিকিৎসা দেন। সুস্থ হওয়ার পর বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। বন্যহাতিগুলোর বয়স ৩০-৪০ বছর হবে। এ বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের দিকে লোকালয়ের আশপাশে সেগুলোকে দেখা গিয়েছিল। এর পর থেকে আর দেখা মিলেনি। বাংলাদেশ ও ভারতের অংশে হাতিরা খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়।

ফরেস্ট ভিলেজাররা (বন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা) বলেন, বনে হাতির খাবারের সংকট রয়েছে। তারা বনের কচি বাঁশ, রামকলা নামের এক ধরনের বুনোকলা খায়। বনে আগের মতো বাঁশ নেই, বুনোকলার গাছ নেই। এসব হাতি মানুষ, ফসলের তেমন ক্ষতি করে না। পাশাপাশি বনে কিছু পোষা হাতিও বিচরণ করে থাকে।

জানা গেছে, ২০১৫-১৬ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংগঠন আইইউসিএন পাথারিয়া হিল রিজার্ভ ফরেস্টে গুগল মানচিত্রের মাধ্যমে হাতির ওপর জরিপ চালায়। আইইউসিএন, বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি কর্মকর্তা ও কারিগরি কমিটির সদস্য মোহাম্মদ সুলতান আহমেদ জরিপে পাওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে ওই সভায় বলেন, পাথারিয়া হিল রিজার্ভ ফরেস্টের আয়তন ২৭ হাজার ৬০০ একর। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৫৫০ একর পড়েছে বাংলাদেশে। বাকিটা ভারতের আসাম রাজ্যে। বাংলাদেশ অংশের কিছু জমি আবার খাসশ্রেণির। সরকার বিভিন্ন চা-বাগানের নামে এসব জমি ইজারা দিয়েছে।

সুলতান আহমেদ বলেন, ওই সময় জরিপে সাতটি বন্যহাতি পাওয়া গেছে। এখন সংখ্যা কমে তিনে দাঁড়িয়েছে।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাথারিয়ার লাঠিটিলা বনবিটের অধীনে ৫ হাজার ৬৩১ হেক্টর বনভূমি রয়েছে। মৌলভীবাজারের ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সিলেট বনবিভাগের জুড়ী ফরেস্ট রেঞ্জের লাঠিটিলা পাথারিয়া হিল রিজার্ভ ফরেস্টের অংশ। ২০১৫ সালের সর্বশেষ পরিমাপ অনুযায়ী বর্তমানে সংরক্ষিত বনের আয়তন ৮০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে লাঠিটিলার আয়তন ২০ বর্গকিলোমিটার।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির বলেন, দেশের মধ্যে লাঠিটিলা বন একটি সমৃদ্ধ বন হিসেবে পরিচিত। ওই বনে গতবছর কয়েকটি হাতির দেখা মিলেছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে মাঝেমধ্যে হাতির দেখা মিলে এ বনে। বনটি হাতির জন্য কতটা উপযোগী তা সঠিকভাবে জরিপ করা হয়েছে বিশেষায়িত কমিটির মাধ্যমে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মতামতও চূড়ান্ত হওয়ার পথে। খুব শীঘ্রই কমিটির সকল সদস্যদের মতামত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া হবে।

তিনি বলেন, সবাই মিলে চেষ্টা করলে আমরা অবশ্যই ভালো কিছু করতে পারব। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় রাখবে বনবিভাগ। পাশাপাশি বন জমিদারদের প্রতি আহ্বান থাকবে লাঠিটিলা বনের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি বজায় রাখতে সকলে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

পরিবেশ কর্মী সাংবাদিক খোরশেদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, পাথারিয়া বনবিট প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ভালো স্থান ছিল। এজন্য হাতিগুলো এখানে বিচরণ করতো বেশি। বনের মূল ভূখণ্ডে বনবিভাগের আয়োজনে বনায়ন করার কারণে আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। বনায়নের কারণে বিভিন্ন জাতের গাছ ও বাঁশ কাটা পড়েছে। সেজন্য এখান থেকে বন্যহাতি বিলুপ্ত হচ্ছে। তবে লাঠিটিলায় যে তিনটি মাদি হাতি রয়েছে সেগুলো রক্ষায় বন বিভাগ কাজ করছে।

বন অধিদপ্তর মনে করে, হাতি সংরক্ষণ ও প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা গেলে দেশের অন্যতম এই বনাঞ্চল হাতি সংরক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে লাঠি টিলায় বন ও বন্য হাতির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের নিরাপদ বসবাসও নিশ্চিত করা হবে। পরবর্তী ধাপে বিষয়টি বাস্তবায়নের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *