বিটিআরআইয়ে শোভা ছড়াচ্ছে বিরল প্রজাতির আফ্রিকান মাখন গাছ

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই)। প্রায় ১০০ হেক্টরের অধিক (২৫০ একরের বেশি) জায়গা নিয়ে স্থাপিত এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পুরো এলাকাজুড়ে যেন গাছের বাগান। রয়েছে সারি-সারি চা গাছসহ বিভিন্ন ফুল, ফল, ঔষধি জাতের হাজারো গাছ। এ সমৃদ্ধ গাছ বাগানের মাঝে মাথা উচু করে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে একটি গাছ, যা সাধারণের কাছে অনেকটা অপরিচিত। ইনস্টিটিউটের মূল কার্যালয় ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে রাস্তার পাশে মাঠে এ গাছটি ইনস্টিটিউটে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী, দেশের বিভিন্ন চা বাগান থেকে প্রশিক্ষণ ও নানা কারনে বিটিআরআইতে আসা ব্যবস্থাপক-সহকারী ব্যবস্থাপকবৃন্দ, দেশ-বিদেশে পর্যটকের আকর্ষনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। অনেকটা ছাতার মতো চারপাশে ঢালপালা ছড়িয়ে থাকা এ গাছটিতে প্রতি বছর শীতের শেষে অনেকটা হলদেটে রঙের ফুল ফুটে। এ গাছটির ফুল যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনি পাতাও বেশ সুন্দর। ফুলগুলো ফুটে থোকায়-থোকায়। পাতার গড়নও গাছটিকে অন্যান্য গাছ থেকে আলাদা করে রাখে। বিটিআরআই এলাকায় প্রায় সব গাছের নিচে নাম লেখা বোর্ড থাকলেও এ গাছটির নিচে বা আশপাশে কোন বোর্ড নেই। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন এ গাছটি আমাদের দেশে বিরল। গাছটির নাম ‘আফ্রিকান মাখন গাছ’। বিটিআরআই একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ মাখন গাছটি ১৯৯১ বা ১৯৯২ সালের দিকে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তৎকালীন পরিচালক ড. এস এ রশিদ সরকারি সফরে অষ্ট্রেলিয়া গমন করেন। সেখানের একটি বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রথম তিনি গাছটি দেখতে পান। প্রথম দেখাতেই গাছটি তাঁর ভারো লাগে। পরে দেশে ফেরার সময় তিনি একটি একটি চারা সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। অষ্ট্রেলিয়া সফরের পরপরই ড. এস এ রশিদের কর্মস্থল পরিবর্তন হয়। ফলে তিনি অতি যত্ন করে অষ্ট্রেলিয়া থেকে আনা গাছটি রোপন করে যেতে পারেননি। ড. এস এ রশিদের পর বিটিআরআইয়ের পরিচালক হিসেবে পদায়ন হন এম মজলিস মোল্লা। তিনিও এক বছরের কর্মকালে গাছটি রোপণ করেননি। এরপর বিটিআরআইয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এ. এফ. এম বদরুল আলম। তিনি বিটিআরআইয়ের গবেষণাগারে যত্ন রাখা মাখন গাছটি মূল কার্যালয় ভবনের পাশে রোপণ করেন। রোপণের কয়েক বছর পর থেকে গাছটিতে ফুল ফুটতে শুরু করে। ফুলের পর আসে ফল। মূলত এ গাছের ফল থেকেই বিশ্বের নানা দেশে তৈরি করা হয় মাখন। কুলাউড়া উপজেলার লোহায়নি-হলিছড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক সোহান আনসারী বলেন, ‘বিটিআরআইতে প্রতি বছর চার থেকে পাঁচবার প্রশিক্ষণে যেতাম। সে সময়ে গাছটি আমাদের আকৃষ্ট করতো। শীতের শেষে খুবই সুন্দর ফুল চারপাশের পরিবেশটাই যেন বদলে দিত।’ রাজধানীর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাজিব পাল বলেন, ‘গত বছর শ্রীমঙ্গলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে এসে বিটিআরআই ক্যাম্পাসে মাখন গাছ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। প্রথমে গাছটির নাম না জানলেও বিটিআরআইয়ের একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার কাছ থেকে গাছটির নাম জানতে পারি। এ বছর আমি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পুনরায় শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে আসার পর এ গাছটির সাথে ছবি ও ভিডিও করে নিয়েছি। গত বছর যখন এসেছিলাম তখর গাছটিতে ফুল ছিল না। তবু গাছটির পাতা ও ছড়ানো ঢালপালা দেখেই মুগ্ধ হই। এ বছর বোনাস হিসেবে পেয়েছি গাছটির অসাধারণ ফুল। সত্যিই বিমোহীত।’ ভ্রমণবিষয়ক লেখক ও ইকো ট্যুর গাইড শ্যামল দেববর্মা বলেন, ‘প্রতিদিনই শ্রীমঙ্গলে অসংখ্য পর্যটক আসেন এ উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। বিটিআরআই এ উপজেলার অন্যতম একটি পর্যটন স্পটও। সেই সাথে বিটিআরআইতে যুক্ত হয়েছে বিরল প্রজাতির ‘আফ্রিকান মাখন’ ও ‘নাগলিঙ্গম’ গাছ। যা এখানে আগত পর্যটকদের তনোমন ভরিয়ে দেয়। এই দুটি গাছে যখন ফুল ফুটে তখন পর্যটকরা আনন্দে উদ্বেলিত হন।’ প্রকৃতি ও পরিবশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন তাঁর এ নিবন্ধে মাখন গাছ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। মাখন গাছ (Pentadesma butyracea) পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন থেকে ক্যামেরুন পর্যন্ত বিস্তৃত গ্রীষ্মমন্ডলীয় আফ্রিকার বনাঞ্চলের স্থানীয় এক বৃক্ষ। এ গাছের ফল থেকে Kpangnan মাখন নামক এক ধরনের মাখন তৈরি হয়। পশ্চিম আফ্রিকার টোগো ও বেনিনে এই গাছের ফল থেকে তৈরি মাখন বিক্রি হয়। আবার ইউরোপেও এই মাখন ‘হলুদ মাখন’ নামে বিক্রি হয়। Kpangnan মাখনের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর উচ্চ স্টিগমাস্টেরল সামগ্রী। গবেষকদের মতে, স্টিগমাস্টেরল ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারসহ কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। স্টিগমাস্টেরল হলো এক ধরনের উদ্ভিজ্জ চর্বি, যা সাধারণত বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ ও ফল অংশে পাওয়া যায়। যেমন ক্যালাবার বিন, সয়াবিন তেল, রেপসিড তেল ও কোকো মাখন। এ ছাড়া আফ্রিকার দেশগুলোতে এই মাখনের বহুমাত্রিক ব্যবহার লক্ষ্যনীয়। এতে উদ্ভিদ স্টেরলের পরিমাণ শতকরা ৪৫ ভাগ। অত্যন্ত আকর্ষনীয় এই গাছের উচ্চতা ৬০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *