২৮ বৃটিশ পথিকৃৎদের সমাধি কুলাউড়ার লংলা সিমেট্রিতে  পর্যটকদের কাছে এটি হতে পারে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত টিলাগাঁও ইউনিয়নে ডানকান ব্রাদার্সের লংলা চা বাগান। এই রাবার বাগান এলাকায় রয়েছে অনেক পুরনো ঐতিহাসিক লংলা সিমেট্রি বা কবরস্থান। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলাদেশের চা শিল্পের সূচনা ও বিকাশে অবদান রাখা বিদেশি ট্রি প্লান্টার ও তাদের স্বজনরা।

১৮৫৭ সালে মালনীছড়া চা-বাগান স্থাপনের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চা-শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। এর ২৩ বছর পর ১৮৮০ সালে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন জায়গায় তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা বাণিজ্যিকভাবে চায়ের আবাদ শুরু করে। ব্রিটেন থেকে নিয়ে আসা হয় অভিজ্ঞ টি প্লান্টারদের। ১৮৮৫ সাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসনে থাকা পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে এ অঞ্চলে মৃত্যুবরণ করা ব্রিটিশ টি প্লান্টারদের মধ্যে ২৮ জনকে সমাহিত করা হয় লংলা সিমেট্রিতে।

সিমেট্রির ১ নম্বর কবরে শায়িত আছেন এইচ মারিল্লিয়্যার যিনি লংলা বাগানে মারা যান। ২ নম্বর কবরে শায়িত আছেন জে ই ডেন্টারের। তিনি ১৯৪৫ সালের ৩ ডিসেম্বর ফুলতলা চা বাগানে মারা যান। ৩ নম্বর সমাধিতে আছেন ডি কেনেডি। তাঁর মৃত্যু ১৯৩০ সালের ৪ এপ্রিল সমনভাগ চা বাগানে। ৪ নম্বর কবরে শায়িত আছেন টি ডাব্লিউ ব্লিওয়েট। তাঁর মৃত্যু ১৮৯১ সালের ২৫ মার্চ সমনভাগ চা বাগানে। ৫ নম্বর কবর শায়িত আছেন ডি ফার্গুসন। তিনি ১৯২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সমনভাগ চা-বাগানে মারা যান। ৬ নম্বর কবরে শায়িত আছেন আর উড। তাঁর মৃত্যু ১৯১১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ফুলতলা বাগানে। ৭ নম্বর কবরে শায়িত আছেন এ বি উরথিংটন। তাঁর মৃত্যু ১৯৪০ সালের ১৭ এপ্রিল ফুলতলা বাগানে, ৮ নম্বর কবরের পি আর উরথিংটন ১৯৪০ সালের ২০ এপ্রিল, ৯ নম্বর কবরের ই বেটসন ১৯০৯ সালে সমনভাগ বাগানে মারা যান। ১০ নম্বর কবরের জি ডব্লিউ কেল্লেনার ১৯১৫ সালের ২০ অক্টোবর শিলুয়া বাগানে, ১১ নম্বর কবরের এফ জে রোজ ১৯১৫ সালের ১৫ নভেম্বর গাজীপুর বাগানে, ১২ নম্বর কবরের জে বি মইর ১৯৫০ সালের ২৪ জুন ধামাই বাগানে, ১৩ নম্বর কবরের পি রশিদ ১৯৬৫ সালের ২৪ জানুয়ারি রাজনগর বাগানে মৃত্যুবরণ করেন। ১৪ নম্বর কবরে শায়িত আছেন ডব্লিউ ম্যারিল্লিয়্যার। তিনি ১৯২৩ সালের ৮ জুলাই লংলা ভ্যালীতে মারা যান। ১৫ নম্বর কবরের আর আর এইচ মার্টিন তিনি ১৯১১ সালের ২ জুলাই ইন্দোনগর বাগানে মারা যান। ১৬ নম্বর কবরের এফ বাটলার ১৯০১ সালে ও ১৭ নম্বর কবরের এ সি ড্যানিয়েল ১৯০০ সালের ২১ নভেম্বর মারা যান। ১৮ নম্বর কবরের পিবি লিফ্রেন্স ১৯০৬ সালের ৪ ডিসেম্বর লংলা ভ্যালীতে, ১৯ নম্বর কবরের মিসেস ইকিন্স ১৯০৯ সালের ২০ অক্টোবর সমনভাগ বাগানে মারা যান। ২০ নম্বর কবরের ডব্লিউ প্রেন্টিস ১৮৬৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে জুড়ী নদীতে মৃত্যুবরণ করেন। ২১ নম্বর কবরের বি লগান ১৯৮৫ সালের ১৬ এপ্রিল ও ২২ নম্বর কবরের পি বি রিডাউট ১৮৯৭ সালের ১৩ জুলাই লংলা বাগানে মারা যান। ২৩ নম্বর কবরের জন ফেড্রিক অল্লানসন ১৯০৮ সালের ৫ জুন রত্না বাগানে মারা যান। ২৪ নম্বর কবরের সি ডি সুটারল্যান্ড ১৯১৪ সালের ৯ জানুয়ারি লংলা বাগানে মারা যান। ২৫ নম্বর কবরের তমাস এ্যায়ার্ড ১৯০০ সালে লুয়াইউনি বাগানে, ২৬ নম্বর কবরের জিএমএম বালফৌর ১৮৯১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্বতপুর বাগানে মারা যান। ২৭ নম্বর কবরের এইচ ডি বসওয়েল ১৮৯৮ সালের ২৬ আগস্ট মারা যান। এর সূত্র ধরে কৌতুহলী গবেষকরা হয়তো ব্রিটিশ শাসন, চা-শিল্পের বিকাশ, এমনকি সমকালীন স্থানীয় সমাজ সম্পর্কেও অনেক তথ্য পেতে পারেন। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনা পড়ে আছে অবহেলায়। সিমেট্রির কবরগুলোর মূল্যবান পাথর চুরি হয়ে যাচ্ছে। অথচ গবেষণার উপাদানের পাশাপাশি এটি ইতিহাসে আগ্রহী পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্য হতে পারে।

এর মধ্যে সিমেট্রির অনেক কবরের মূল্যবান শ্বেতপাথর ও কবর ভেঙে ফেলা হয়েছে। নিরাপত্তাবেষ্টনী বলতে আছে মরিচা পড়া কাঁটাতারের বেড়া। পাহারাদার থাকলেও দৃশ্যত নিরাপত্তার ঘাটতি আছে। পরিবার-পরিজন বহুদূর স্বদেশে ফেলে রেখে সেই আমলের ওই দুর্গম ও প্রতিকূল পরিবেশে থেকে যাঁরা চা-শিল্পের বিকাশে অবদান রেখেছেন তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। সম্প্রতি লংলা চা-বাগানে বেড়াতে এসেছিলেন স্থানীয় অঞ্চলের পর্যটক সাংবাদিক মাহফুজ শাকিল ও মহি উদ্দিন রিপন। তাঁরা আক্ষেপ করে বলেন, দেশে চা-বাগান সৃজনে যাঁরা পথিকৃৎ ছিলেন তাঁদের কবরকে এভাবে অযত্ন-অবহেলায় ফেলে রাখা ঠিক হয়নি। এর অতীতে যে জৌলুস ছিল বর্তমানে তার প্রায় কিছুই নেই। এই পর্যটকরা কবরস্থানটি সংরক্ষণে যথাযথ সীমানাপ্রাচীর তৈরিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিলেন।

এ বিষয়ে লংলা চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বলেন, ‘লংলা সিমেট্রি অরক্ষিত নয়। আমরা নিয়মিত এর দেখাশোনা করি। অতীতে চুরি করার উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তদের ভেঙে ফেলা কবরগুলো মেরামত করেছি। সিমেট্রি সব সময় আমাদের নজরদারিতেই আছে।’ বৃটিশদের কোন স্বজন কবর দেখতে আসেন কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০১০ সালে একজন ব্রিটিশ নাগরিক এসেছিলেন লংলা সিমেট্রি দেখতে। তিনি জানতে পেরেছিলেন, এই সিমেট্রিতে তাঁর বাবার কবর রয়েছে। তিনি বাবার কবর শনাক্ত করে তা পাকা করান। মাঝে মাঝে ডানকান কম্পানির চেয়ারম্যানসহ লন্ডন দপ্তরের শীর্ষ ব্রিটিশ কর্মকর্তারা এটি পরিদর্শন করতে আসেন।

লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘লংলা চা-বাগানে অবস্থিত খ্রিস্টানদের কবরস্থান একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটি কালের সাক্ষী হয়ে আছে। এই সিমেট্রি সংরক্ষণ করার ওপর বাগান কর্তৃপক্ষকে আরো গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। স্থানীয়দের পাশাপাশি ব্রিটিশ ও অন্য বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এটি আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান হতে পারে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *