জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নে অবস্থিত বালাইরমা খাসিয়া পুঞ্জির উদ্যোগে নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শওকতুল ইসলাম শকুকে এক জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠান শুরুর আগে নিজেদের অনন্য সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য মেনে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর লোকজন এমপিকে একটি বিশেষ ঝুলন্ত চেয়ারে বসান। এরপর পুঞ্জির পুরুষ লোকজন সেই চেয়ারটি কাঁধে তুলে নিয়ে চারপাশ ঘুরে এমপিকে সম্মান জানিয়ে বরণ করে নেন। এলাকা ও পুঞ্জিবাসীর উন্নয়নে নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্যের এই আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আদিবাসীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে।
৩১ মে রোববার বিকেলে বালাইরমা খাসিয়া পুঞ্জিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুঞ্জির মন্ত্রী রিওয়েল খংলার সভাপতিত্বে সংবর্ধিত প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শওকতুল ইসলাম শকু। প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি শকু পুঞ্জিবাসী তথা এলাকার মানুষের এই অভূতপূর্ব ভালোবাসার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমি যতটুকু জানি স্বাধীনতার পর থেকে নাকি কোন এমপি এই পুঞ্জিতে আসেননি। আমি আশ্চর্য হলাম পুঞ্জির লোকজন না দেখে তাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। কিন্তু তারা কোন কথা রাখেনি। আপনাদের খোঁজখবর রাখেনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যারা কুলাউড়ার এমপি’র দায়িত্বে ছিলেন তারা সঠিকভাবে খাসিয়াদের কল্যাণে কাজ করেননি। এবার কথা রাখার পালা এসেছে, এবার আপনাদের এমপি আপনাদের কথা রাখবে। আমি দল, মত, নির্বিশেষে নিজ দায়িত্বে
আদিবাসী সম্প্রদায়সহ কুলাউড়ার সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করে যাবো। বিশেষ করে আপনাদের সকল সংকটে আমাকে সবসময় পাশে পাবেন। আমি একটি কথা সবসময় বলি, উই আর নট বাঙ্গালি, উই আর বাংলাদেশী। এই বাংলাদেশী শব্দটার ওপর হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খাসিয়া, গারো, মনিপুরী, চাকমাসহ সকল সম্প্রদায় মিলে আমরা বাংলাদেশী। অতীতে একসময় বাঙ্গালি বলে আপনাদের আলাদা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেদিন সেটা চিন্তা করেছিলেন এবং চিন্তা করে বলেছিলেন আমরা সবাই বাংলাদেশী, আমরা বাঙালী নই। সুতরা এই বাংলাদেশে, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের মিলিত একটি স্থান হলো এই বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি আরো বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। যার লক্ষ্য তাদের জীবনমান উন্নত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। পাহাড়ে বসবাসরত আদিবাসীরা এখনো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের সুবিধাসহ বিভিন্ন সূচকে সমতলের জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সরকার তাদের মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, আদিবাসীদের প্রধান আয়ের উৎস পান গাছ যারা কর্তন করে তাদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহ বিভিন্ন পুঞ্জিতে রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া পুঞ্জির নাগরিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে যারা দালালী ও চাঁদাবাজী করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন এমপির সহধর্মিণী মিলি ইসলাম, কুলাউড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন ভুঁইয়া, সদর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুকিত বুলবুল, উপজেলা বিএনপির সাবেক ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম রাজু, উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল বারী সুহেল, কুবরাজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রত্যুষ আসাক্রা, মেঘাটিলা পুঞ্জির হেডম্যান মনিকা খংলা, ঝিমাই পুঞ্জির হেডম্যান রানা সুরং, গোজাছড়া পুঞ্জির হেডম্যান জিম খাসিয়া, ছইলতা পুঞ্জির হেডম্যান হীন খাসিয়া, ইউপি সদস্য জমির আলী, সাংবাদিক মহি উদ্দিন রিপন, ইব্রাহিম আলীসহ স্থানীয় বিভিন্ন পুঞ্জির নেতৃবৃন্দসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল স্থানীয় খাসিয়া শিশু শিল্পীদের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ঐতিহ্যবাহী রঙিন সাজে সেজে আদিবাসী শিশু শিল্পীরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করে। তাদের চমৎকার নৃত্য ও গান অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত প্রধান অতিথিসহ সকল দর্শক-শ্রোতাকে মুগ্ধ করে এবং পুরো আয়োজনে এক উৎসবমুখর আমেজ তৈরি করে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে খাসিয়ারা নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান এবং পুঞ্জিবাসীর পক্ষ থেকে খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী উপহার সামগ্রী তুলে দেয়া হয়। এসময় তারা এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, বিশেষ করে পুঞ্জিবাসীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সহ জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে সংসদ সদস্যের সুদৃষ্টি ও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।

