মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারে পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল কেটে একের পর এক গড়ে উঠছে রিসোর্ট। গত কয়েক বছরে জেলায় এমন রিসোর্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০টিতে। অথচ এর বেশিরভাগেরই অনুমোদন ও বৈধতার কোন তথ্য নেই সরকারি দপ্তরগুলোর কাছে। শুরুতে কয়েক বছর নিয়মতান্ত্রিকভাবে কিছু রিসোর্ট গড়ে উঠলেও গত ৫ বছরের চিত্র পাল্টে গেছে। বাসাবাড়ি, পাহাড়-টিলা কেটে কয়েকটি কক্ষ বানিয়েই দেওয়া হচ্ছে রিসোর্টের নাম।
রিসোর্ট নির্মাণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে পাহাড়, টিলা ও বনাঞ্চলে। উঁচু টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে। গভীর বনের ভেতরে তৈরি হচ্ছে কটেজ ও অন্যান্য স্থাপনা। কোথাও কোথাও গাছপালা সরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে রাস্তা ও স্থাপনা। যে কারণে অনেক প্রাণী লোকালয়ে চলে যাচ্ছে। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, এভাবে বন ও পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হলে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হবে। একই সঙ্গে নষ্ট হবে তাদের চলাচলের স্বাভাবিক পথ ও খাদ্যের উৎস।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কমলগঞ্জ উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লাউছড়া এলাকায় ১২৫০ হেক্টর ভূমি নিয়ে ১৯৯৬ সালে লাউছড়াকে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়। লাউয়াছড়া উদ্যান বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান সংরক্ষিত চিরহরিৎ বনাঞ্চল ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা। এরপর ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর ২০১৩ সালে শ্রীমঙ্গলে ১৩ একর জায়গাজুড়ে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ। এরপর ক্রমান্নয়ে পাহাড়-টিলায় কেটে জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট-কটেজ গড়ে উঠেছে শ্রীমঙ্গলে, যার সংখ্যা শতাধিক। শুধু শ্রীমঙ্গরের রাধানগর এলাকাতেই রয়েছে ৪০ থেকে ৪৫টি রিসোর্ট। ফলে মানুষের সমাগম ক্রমান্নয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এতে করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনের জীববৈচিত্র্যে হুমকির সম্মুখিন হতে থাকে ।
স্থানীয়দের সাথে যুক্ত হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বড় বড় কোম্পানি, ধনাঢ্য ব্যক্তি, আইনজীবী, ব্যাংকের কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা এমনকি জনপ্রিয় অনেক তারকারা নামে বেনামে এসব রিসোর্টে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। মূলধারার রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেকে স্থানীয়দের কাছ থেকে মাত্র ২-৩ শতক জমি কিনে রিসোর্ট নাম দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল এবং পরিবেশ কর্মী রাজদীপ দেব জানান, চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর লাউয়াছড়া থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণি লোকালয়ে চলে এসেছে। এর মধ্যে অজগর, পদ্ম গোখরা, আইড ক্যাট স্নেক, সবুজ ফণিমনসা, গন্ধগোকুল, বানর, মেছো বিড়াল বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নির্বিচারে পাহাড় ও জঙ্গল কেটে ফেলা ও প্রাণির আবাসস্থল এলাকায় মানুষের বিচরণ বেড়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীরা তাদের আবাসস্থলকে আর নিরাপদ মনে করতে পারছে না। যে কারণে বন ছেড়ে লোকালয়ে প্রাণিরা বেরিয়ে আসছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য আসম সালেহ সোহেল বলেন, যে কোনো প্রাণিই নিরাপদ আবাসনের প্রত্যাশা করে। কিন্তু বর্তমানে নির্বিচারে পাহাড় ও জঙ্গল কেটে ফেলার ফলে বন্যপ্রাণিরা তাদের আবাসস্থলকে আর নিরাপদ মনে করতে পারছে না।
বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসনের আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রিসোর্ট ও কটেজ। এসব রিসোর্টে ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম আলোর বিকিরণ বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, যা বন্যপ্রাণিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয়কে বিপন্ন করে তোলে।
এর ফলে বন্যপ্রাণির স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ১০-২০টি রিসোর্ট থাকলে হয়তো বিষয়টি একরকম হতো, কিন্তু বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ২০০-তে গিয়ে ঠেকেছে। এছাড়া লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলে খাদ্যেরও যথেষ্ট সংকট রয়েছে। বন্যপ্রাণিরা মূলত নির্জন পরিবেশ পছন্দ করে কিন্তু এই নির্জনতা নষ্ট হওয়ায় এবং নিরাপদ বিকল্প কোনো বাসস্থান না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন জানান, শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১০৩টি রিসোর্ট আছে। পাহাড়ি এলাকা বা কোথাও রিসোর্ট করতে হলে জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। প্রকৃত পক্ষে পরিপূর্ণ রিসোর্টের সংখ্যা শ্রীমঙ্গলে ১০ থেকে ১২টি হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীমঙ্গলের এক রিসোর্ট মালিক বলেন, মৌলভীবাজারের পর্যটনের উন্নতির কথা চিন্তা করেই গ্র্যান্ড সুলতানের মতো পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টের যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ক্যাটাগরির রিসোর্ট, কটেজ তৈরি হতে থাকে। আমরা সরকারের সকল আইন মেনে আমাদের রিসোর্ট পরিচালনা করছি। অথচ এখন দেখা যায় বেপরোয়াভাবে রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব রিসোর্ট কিভাবে হচ্ছে, কার অনুমতি নিয়ে হচ্ছে, তা তদারকি করা খুবই প্রয়োজন।
শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী সেলিম আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্রীমঙ্গলে প্রকৃত অর্থে রিসোর্ট বলতে মাত্র ১০-১৫টি আছে। সরকারি নিয়ম মেনে কর দিয়ে যারা ব্যবসা করছেন, তারা নামসর্বস্ব এসব অবৈধ রিসোর্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো: মাঈদুল ইসলাম জানান, আমাদের কাছ থেকে প্রায় ৫০টি রিসোর্ট হবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছে। যারা নেয়নি তাদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ মামলা হয়েছে। পাহাড় কেটে অনেকেই রিসোর্ট করছেন, তবে তাদের আইনের ফাঁক ফোকফোকরে তাদের আটকানো যাচ্ছেনা। যেসব রিসোর্ট ২০ কক্ষ বা তার অধিক এসব রিসোর্টের ছাড়পত্র আমরা দেই। ২০ কক্ষের নীচে গুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়ার প্রয়োজন হয়না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: জিয়াউর রহমান বলেন, টিলা বা পাহাড় কাটা সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে প্রশাসন তা খতিয়ে দেখছে। শ্রীমঙ্গলে বর্তমানে কতটি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, তাদের ভূমির মালিকানা, অনুমোদন ও লাইসেন্সের অবস্থা কীÑএসব তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ডেটাবেস তৈরির কাজ চলছে। জমি বা টিলার শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন না থাকলে তা করতে দেয়া হচ্ছে না। সম্প্রতি নিয়ম অমান্য করায় দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল ও রিসোর্টগুলো আমরা দেখাশোনা করি। যাঁরা রিসোর্ট করছেন, হয়তো তাঁরা কোনো না কোনো বিভাগ থেকে অনুমতি নিচ্ছেন। আবার না-ও নিতে পারেন। এসব বিষয় জানা নেই।’

